ঢাকা সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নীরব কান্নার আড়ালে মধ্যবিত্ত যাদের গল্প রূপকথার চেয়েও কঠিন

নীরব কান্নার আড়ালে মধ্যবিত্ত যাদের গল্প রূপকথার চেয়েও কঠিন

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি মনে করা হয় তার মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। অথচ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই মধ্যবিত্তের জীবন যেন এক অন্তহীন কৌতুক আর যন্ত্রণার গল্পে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় আর আয়ের সীমাবদ্ধতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও তারা হাসিমুখে ঘুরে বেড়ানোর এক অদ্ভুত অভিনয় করে যাচ্ছে। উচ্চবিত্তদের প্রাচুর্যের অভাব নেই, আর নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র মানুষরা অন্তত লোকলজ্জা ভুলে হাত পাততে পারেন, সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু মধ্যবিত্ত? তাদের না আছে হাত পাতার অধিকার, না আছে লাইনে দাঁড়ানোর সাহস। এই শ্রেণির কান্না চিরকালই নীরব, যা অন্দরেই শুরু হয় আর অন্দরেই শেষ হয়।

আজকের বাজারে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ- সবকিছুর দামেই যেন আগুন লেগেছে। এই পরিস্থিতিতে একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী বা সীমিত আয়ের মানুষের মাসিক বাজেট তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বাসাভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল মেটানোর পর সংসারের চাল-ডাল কেনার মতো ন্যূনতম অর্থ মেলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু এই নির্মম সত্য তারা কাউকে বুক ফেটে বলতে পারেন না। অফিসে ফিটফাট পোশাক পরে যেতে হয়, প্রতিবেশীর সামনে বজায় রাখতে হয় ‘সব ঠিক আছে’ মার্কা একটি কৃত্রিম আভিজাত্য। এই আভিজাত্যের খোলসটাই আজ তাদের জন্য সবচেয়ে বড় কারাগার। ‘মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো- তারা গরিবের মতো সাহায্য চাইতে পারে না, আর ধনীদের মতো খরচ করতে পারে না। তারা শুধু নীরবে ক্ষয় হতে পারে।’

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যখন পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়। চিকিৎসাসেবার অস্বাভাবিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু মধ্যবিত্ত পরিবার এক নিমেষেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। সঞ্চয় বলতে যা থাকে, তা নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ধারদেনা কিংবা জমি-গহনা বিক্রির পালা। মধ্যবিত্তের এই নীরব কান্না কোনো গণমাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ হয় না। কোনো টকশোতে এদের নিয়ে ঝড় ওঠে না। বড় বড় নীতি নির্ধারকরা যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন, তখন সেই পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায় একটি মধ্যবিত্ত বাবার দীর্ঘশ্বাস, যে তার সন্তানের জন্য এক লিটার দুধ কিনতে গিয়ে তিনবার পকেটের টাকা গোনে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানামুখী উদ্যোগের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার সুফল মধ্যবিত্তের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। টিসিবির ট্রাকের পেছনে যখন স্বল্পমূল্যে পণ্য কেনার দীর্ঘলাইন পড়ে, সেখানেও অনেক মধ্যবিত্ত লুকিয়ে, মুখ ঢেকে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। নিজের চিরচেনা শহরের চেনা মানুষের সামনে কম দামে আলু-পেঁয়াজ কিনতে যাওয়ার যে মানসিক যন্ত্রণা, তা শুধু একজন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষই বোঝেন। একটি সুস্থ ও সবল সমাজ গঠনে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই শ্রেণিটিই সমাজে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারক ও বাহক। কিন্তু আজ অর্থনৈতিক চাপে এই শ্রেণির কোমর ভেঙে যাচ্ছে। ক্রমাগত এই চাপের ফলে মধ্যবিত্ত আজ নিম্নবিত্তে পরিণত হচ্ছে, যা একটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর জন্য চরম বিপদের সংকেত। রাষ্ট্র ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাববার সময় এসেছে। শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক দিয়ে একটি দেশের মানুষের সুখ মাপা যায় না। মধ্যবিত্তের জন্য প্রয়োজন বিশেষ অর্থনৈতিক সুরক্ষা। করের বোঝা কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দ্রব্যমূল্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা আজ সময়ের দাবি। মধ্যবিত্ত সমাজ আর কতকাল তাদের আত্মসম্মানের মূল্য দিতে গিয়ে নীরবে কাঁদবে? এই নীরব কান্না যদি একদিন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আর্তনাদে রূপ নেয়, তবে তা পুরো সমাজ ব্যবস্থার জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই মধ্যবিত্তের এই নীরব কান্নাকে অবহেলা না করে, তাদের মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত