ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নিরাপদ জন্মভূমি আজ মৃত্যুপুরীর বধ্যভূমি

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ
নিরাপদ জন্মভূমি আজ মৃত্যুপুরীর বধ্যভূমি

মায়ের গর্ভে দীর্ঘ ২৮০ দিনের অকল্পনীয় ত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি সন্তানের আগমন ঘটে, যা সাধারণ কোনো হিসাবে মেলানো যায় না। এই প্রাণের বিকাশে মাকে সহ্য করতে হয় চরম শারীরিক ও মানসিক ধকল। গর্ভাবস্থার বমিভাব, ক্লান্তি, রক্তশূন্যতা ও অস্থিমজ্জা নিংড়ে পুষ্টি জোগানোর পর আসে প্রসব যন্ত্রণা- যাকে প্রায় ২০টি হাড় একসঙ্গে ভেঙে যাওয়ার সমতুল্য অবর্ণনীয় কষ্ট বলে ধরা হয়। এরপর শুরু হয় বাবা-মায়ের অনন্ত আত্মত্যাগের অধ্যায়। একটি সন্তানকে স্বাবলম্বী করে তুলতে গড়ে প্রায় ২০-২৫ বছর সময় লাগে। এ সময়ে অন্তত দশ হাজার ঘণ্টার বেশি বিনিদ্র রজনী কাটে তাদের। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও সুখের পেছনে হাসিমুখে ব্যয় হয় পরিবারের শেষ বয়সের একমাত্র সম্বল, লাখো টাকার সঞ্চয়। শুধু সন্তানের একটি হাসিমুখ দেখার জন্য বাবা-মায়ের এই নিঃস্বার্থ আত্মদান পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র উপাখ্যান। কিন্তু সেই নাড়িছেঁড়া ধন যখন বিকৃত লালসার শিকার হয়ে লাশ হয়ে ফেরে, তখন জন্মদাতা পিতা-মাতার আর্তনাদে আকাশও ভারী হয়ে আসে। সভ্য ও আধুনিক সমাজে সন্তানের খুনির বিচার চেয়ে যখন বাবা-মাকে দ্বারে দ্বারে ভিখারির মতো ঘুরতে হয়, আর অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘোরে, তখন প্রশ্ন জাগে- এই পৃথিবীতে বাবা-মা হওয়াটাই কি তবে সবচেয়ে বড় পাপ

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আজ চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য মতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৭৮৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭৯টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং ৩১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ভয়াবহ ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে। শুধু এপ্রিল মাসেই অন্তত ৬৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। সামাজিক লোকলজ্জা ও আইনি জটিলতায় বহু ঘটনা আড়ালে থেকে যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি। মানবিকতার এই চরম অবক্ষয় আমাদের প্রতিনিয়ত এক ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আদালতপাড়ার বাতাস আজ স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাসে বিষাক্ত। ২০১৬ সালে কুমিল্লার তনু কিংবা ২০১৭ সালে চলন্ত বাসে রূপা খাতুনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার বিচার আজও চূড়ান্ত হয়নি। রাজধানীর কলাবাগানের আনুশকা থেকে শুরু করে বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে মোসারাত জাহান মুনিয়া- সবকটি ঘটনাই আইনি বেড়াজালে আটকে আছে। ২০১৯ সালে ওয়ারীতে শিশু সায়মা বা যাত্রাবাড়ীর পূজা, এমনকি ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত দংশন করে। নরসিংদীর মাধবদীতে বাবার সামনে থেকে অপহৃত হয়ে সরিষা খেতে খুন হওয়া কিশোরীর লাশ যেন আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতি এক করুণ উপহাস। ময়মনসিংহের টন্নি, আশুলিয়ার পোশাককর্মী, পতেঙ্গা, জকিগঞ্জ, ডুমুরিয়া কিংবা কসবার পৈশাচিক ঘটনাগুলোর বিচার সাক্ষ্যগ্রহণ বা আপিলের অপেক্ষায় বছরের পর বছর আটকে আছে। অপরাধীরা যখন নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করে, তখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তিলে তিলে নিঃস্ব হতে থাকে।? ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।’- হত্যার শিকার শিশু রামিসার বাবার এই চরম হতাশাজনক আর্তনাদ যেন আজ আমাদের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার সেই ব্যর্থতা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

?বিচারপ্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার আরেকটি মূল কারণ আমাদের ফরেনসিক ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, জাতীয় পর্যায়ে আমাদের মূল ডিএনএ (DNA) ল্যাব মাত্র একটি। ঢাকা মেডিকেল কলেজের এনএফডিপিএল (NFDPL) এবং সিআইডির আরেকটি ল্যাব দিয়ে গোটা দেশের কাজ চলছে। ২০০৬ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৮৫টি মামলা থেকে ৩৫ হাজার নমুনা এসেছে, যার ৬৫ শতাংশই ধর্ষণ মামলা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত