ঢাকা বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সবুজ পৃথিবীর বুকে টেকসই ভবিষ্যতের স্বপ্ন সংকট ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ

ওসমান গনি
সবুজ পৃথিবীর বুকে টেকসই ভবিষ্যতের স্বপ্ন সংকট ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ

প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি এই বাংলাদেশ। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা রূপের সমান্তরালে এই ভূখণ্ডটি চিরকালই জলবায়ুর নানামুখী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের অস্তিত্বের সামনে এক অভূতপূর্ব সংকট দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হিমালয়ের বরফ গলা থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক প্রথম সারির ভুক্তভোগী। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর রুদ্ররূপ মোকাবিলা এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রেখে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন আর শুধু কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং আমাদের টিকে থাকার মূল মন্ত্র।

পরিবেশ ও মানুষের সম্পর্ক আদিকাল থেকেই অত্যন্ত নিবিড়। মানবসভ্যতার প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে ছিল প্রকৃতির অকৃপণ অবদান। কিন্তু অতি-শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে আজ প্রকৃতি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। বন উজাড়করণ, নদী দূষণ, প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র আজ বিপন্ন। বাংলাদেশে এই সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে আমাদের ঘনবসতি এবং সীমিত ভূখণ্ডের কারণে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।

পরিবেশের এই অবক্ষয় শুধু জনস্বাস্থ্যকেই হুমকিতে ফেলছে না, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকেও মন্থর করে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, এটি আমাদের বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা। অসময়ের বন্যা, তীব্র তাপদাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং ঘন ঘন ধেয়ে আসা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এখন আমাদের বার্ষিক ক্যালেন্ডারের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে সমুদ্রের লোনা পানি ঢুকে পড়ার কারণে লাখ লাখ মানুষ তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি এবং কৃষিজমি হারাচ্ছে। এই লোনা পানির আগ্রাসন শুধু কৃষির ক্ষতি করছে না, সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর। বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে এসব মানুষ দলে দলে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংকট, যাকে আমরা বলছি ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’। নদীমাতৃক এই দেশে নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রতি বছর হাজারও পরিবার যেভাবে নিঃস্ব হচ্ছে, তা যেকোনো অর্থনীতির জন্যই এক বিশাল বোঝা।

কৃষিপ্রধান এই দেশে জলবায়ুর সামান্য হেরফের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে। যখন কোনো মৌসুমে হুট করে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি শুরু হয়, তখন মাঠে কৃষকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসল এক নিমেষেই নষ্ট হয়ে যায়। দেশের খাদ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো এখন প্রায়ই খরার কবলে পড়ছে, আবার পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং বন্যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। জলবায়ুর এই অনিশ্চয়তার মুখে আমাদের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন ধরনের ফসলের জাত উদ্ভাবন ও তার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।

এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই আমাদের উন্নয়ন যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে, আর এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে টেকসই উন্নয়নের ধারণা। উন্নয়ন বলতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধুই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা বহুতল ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধিকে বুঝে এসেছি। কিন্তু যে উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে পারে না, তাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। টেকসই উন্নয়ন হলো এমন এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি, যা বর্তমানের চাহিদা মেটায়; কিন্তু প্রকৃতির ভবিষ্যৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে ধ্বংস করে না। আমাদের এমন এক অর্থনৈতিক মডেলের দিকে যেতে হবে, যেখানে কলকারখানার চাকা ঘুরবে; কিন্তু তা থেকে নির্গত বর্জ্য আমাদের নদী বা বাতাসকে বিষাক্ত করবে না। পরিবেশকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা আসলে এক ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ এরইমধ্যে বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে এক সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও আমরা এর অন্যতম প্রধান শিকার। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্ষতিপূরণ বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ডের দাবি আদায়ে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তার আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই এবং বাংলাদেশ তা করেনি। নিজস্ব অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করে বিভিন্ন অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে এই বিশাল সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত পরিবেশ সচেতনতাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।

টেকসই উন্নয়নের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। আমাদের এখনও সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে, যা পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। এই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে আমাদের ধীরে ধীরে সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে ঝুঁকতে হবে। দেশের লাখ লাখ বাড়িতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার গ্রামীণ জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা টেকসই শক্তির একটি চমৎকার উদাহরণ। এর পাশাপাশি আমাদের শিল্প খাতকে ‘সবুজ শিল্প’ বা গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাক খাত এরমধ্যেই পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে বিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে, এই ধারাকে অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতেও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

পরিবেশ রক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বনভূমি ও জলাশয়ের সংরক্ষণ। সুন্দরবন আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জন্য এক প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, যা বারবার বড় বড় ঘূর্ণিঝড় থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। এই সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনাঞ্চল রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। একই সঙ্গে দেশের নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওর অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। নদী দখল ও দূষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের তৈরি নানামুখী পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো হলে পরিবেশের ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে। বনায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মোট ভূখণ্ডের ২৫ ভাগ বনভূমি নিশ্চিত করার লক্ষ্য পূরণে সর্বস্তরের মানুষকে শামিল করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন প্রজন্ম যদি ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে বড় না হয়, তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা আরও কঠিন হবে। প্রতিটি শিশুকে গাছ লাগানো, পানির অপচয় রোধ করা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলার শিক্ষা পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে দিতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের অভ্যাসের পরিবর্তনও পরিবেশ সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, বর্জ্য আলাদা করে ফেলার মানসিকতা এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমেই একটি সচেতন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার এই লড়াইয়ে যুব সমাজের ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রগামী হতে পারে। তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে গ্রিন স্টার্ট-আপ বা পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা দরকার। পরিবেশ সুরক্ষাকে যখন তরুণ প্রজন্ম নিজের ক্যারিয়ার এবং জীবনের অংশ করে নেবে, তখন পরিবর্তনটা আসবে ভেতর থেকে এবং তা হবে দীর্ঘস্থায়ী।

পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমরা প্রকৃতিকে যেভাবে দেখব, প্রকৃতিও আমাদের ঠিক সেভাবেই ফিরিয়ে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই মহাদুর্যোগের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের এমন এক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পথ বেছে নিতে হবে যা পরিবেশবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। বর্তমানের সাময়িক লাভের জন্য ভবিষ্যৎকে বন্ধক দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। প্রাকৃতিক সম্পদকে পরম যত্নে আগলে রেখে, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। আমাদের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি ও সঠিক পরিকল্পনাই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যেতে।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত