প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ জুন, ২০২৬
বাঙালির জীবনে ঈদ মানেই শেকড়ে ফেরার অনাবিল আনন্দোৎসব। কিন্তু প্রতিবছর রাজধানী থেকে বাড়ি ফেরার এই যাত্রা ক্রমেই টিকে থাকার এক ভয়ংকর লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে। কোরবানির ঈদে লাখ লাখ মানুষ যখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ছোটেন, তখন স্টেশনগুলোতে উৎসবের আমেজের বদলে রাজত্ব করে চরম বিশৃঙ্খলা আর ভোগান্তি। সাম্প্রতিক সময়ে উৎসবের আনন্দযাত্রার সমান্তরালে মানুষকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে রক্তভেজা রেললাইন আর স্বজনহারাদের বুকফাটা হাহাকার। প্রতিবছরের এই চিরচেনা দুর্ভোগ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং এটি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘস্থায়ী অব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের অসচেতনতারই প্রমাণ।
একটি রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ঈদযাত্রা আর আনন্দের থাকে না; পরিণত হয় চরম হতাশায়।
?এবারের ঈদে রেলপথে অব্যবস্থাপনার চিত্র সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়েছে। বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারেননি। রেলওয়ে স্বীকার করেছে, ঈদের বিপুল চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ পূরণের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই বিপুল চাপ সামাল দিতে এবার ঢাকা স্টেশন থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০-৬৫ হাজার মানুষ যাত্রা করেছেন। এর জন্য ৫১টি বাড়তি বগি ও ১০টি বিশেষ ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার ৩০ মিনিটেই প্রায় ৬০ লাখ মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অথচ এত আয়োজনের পরও তদারকির অভাবে, টিকিট কেটেও ট্রেনে উঠতে না পারার চূড়ান্ত ভোগান্তির শিকার হয়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। কমলাপুরের মতো প্রধান স্টেশনে শত শত এপিবিএন সদস্য ও তিন স্তরের নিরাপত্তার দাবি করা হলেও ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে দেখা যায়, পুরো ট্রেনই টিকিটবিহীন যাত্রীদের দখলে। যাত্রীরা বারবার অনুনয়-বিনয় করেও পুলিশ বা রেল কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পাননি। এক যাত্রীর আর্তনাদ ছিল- ‘টিকিট আছে, সিট আছে, কিন্তু দরজা খুলছে না; পুলিশও বলছে এটা তাদের দায়িত্ব নয়।’ শত শত মানুষ প্ল্যাটফর্মেই ক্ষোভ ও হতাশায় চোখের জল ফেলেছেন, যা আমাদের ভঙ্গুর রেল ব্যবস্থাপনার এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
এমন অরাজক পরিস্থিতির সবচেয়ে অসহায় শিকার হয়েছেন নারী যাত্রীরা। ট্রেনের দরজাগুলো যখন অবৈধ যাত্রী ও অতিরিক্ত মানুষের চাপে অবরুদ্ধ, তখন অনেক নারীকে নিরুপায় হয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে। ভিড় ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষ নারীদের হেনস্তা করেছে।
নারীদের সুরক্ষায় বিশেষ কামরা বা টহল দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা বাস্তবে শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। আর এর চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ ঘরের মা-বোনদের। ট্রেনের ভেতরে যখন নরকযন্ত্রণা, ছাদ তখন হয়ে উঠেছে মৃত্যুর আরেক উন্মুক্ত ফাঁদ। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হাজার হাজার যাত্রী ট্রেনের ছাদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করেছেন। বেপরোয়া যাত্রার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ময়মনসিংহের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো তা চোখে আাঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ২৬ মে চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে মুসা নামের এক যুবকের মৃত্যু হয় এবং ৩০ মে দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে রুবেল মিয়া নামের আরেক যুবকের মাথা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর আগে ২০ মে বনানীতেও এক কিশোর প্রাণ হারায়। শুধু মৃত্যুই নয়, ট্রেনের ছাদগুলো এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যেও পরিণত হয়েছে। তেজগাঁও এলাকায় চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিনতাইকারীদের হামলায় সর্বস্ব হারিয়ে দুই কিশোর নিচে নিক্ষিপ্ত হয়ে পঙ্গুত্বের মুখে পড়েছে। মানুষ যেমন নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে বেআইনিভাবে ছাদে উঠে ভুল করছেন, তেমনি পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীও এই চলন্ত মৃত্যুফাঁদ থেকে যাত্রীদের সুরক্ষা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
উৎসবের সময়ের এসব অবর্ণনীয় ভোগান্তির পেছনে শুধু নিয়তি বা কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাই দায়ী নয়, সাধারণ মানুষের অসচেতনতাও সমানভাবে দায়ী। ২৭ মে নরসিংদী রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পুরো দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ঈদের কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফেরার আনন্দে বিভোর ২৭ বছর বয়সী সাথী বেগম ও তার কোলের ছোট্ট শিশু দ্রুতগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মুহূর্তেই প্রাণ হারান। চোখের পলকে স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে দিনমজুর স্বামী সুজন মিয়া যখন রক্তাক্ত ও নিথর স্ত্রীকে এক কাঁধে তুলে নেন আর অন্য হাতে বেঁচে যাওয়া পাঁচ বছরের কাঁদতে থাকা মেয়েটির হাত ধরে হাসপাতালের দিকে ছোটেন, তখন চারপাশের পরিবেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এমন চরম বিপদের মুহূর্তেও চারপাশের কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। সুজন মিয়ার এই অসহায় পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনা কীভাবে উৎসবের অনাবিল আনন্দকে মুহূর্তের মধ্যেই চিরস্থায়ী বিষাদে পরিণত করতে পারে।
একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে উৎসবের আনন্দ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যতদিন না রেল কর্তৃপক্ষ প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে পর্যাপ্ত খালি বগি সংযোজন ও সঠিক বোর্ডিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে, ততদিন টিকিটধারী যাত্রীদের এমন লাঞ্ছনার শিকার হতেই হবে। একইভাবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও শুধু দর্শকের ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষের ওপর দোষ চাপালেই চলবে না; জনগণকেও বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রেল মন্ত্রণালয় বা তদন্ত কমিটির গৎবাঁধা সান্ত¡না সাধারণ মানুষের বুকফাটা রক্তক্ষরণ থামাতে পারবে না। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার আগে আমরা যদি নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা দিতে না পারি, তবে এভাবেই প্রতিটি ঈদ আমাদের জন্য বয়ে আনবে অসহনীয় বিষাদ; আর কর্তৃপক্ষের অবহেলার মূল্য দিতে গিয়ে ঝরে পড়বে অগণিত প্রাণ।
আমানুর রহমান
কবি ও লেখক, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ