ঢাকা বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব

মো. তাহমিদ রহমান
কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে তাদের শৈশব

শৈশব হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় শিশুরা খেলাধুলা, গল্প, প্রকৃতি, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং পারিবারিক সান্নিধ্যের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠে। শৈশবের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো রঙিন স্মৃতি, সরলতা আর নিঃশব্দ আনন্দের গল্প। জীবনের সবচেয়ে নির্ভার সময় হলো শৈশব, যেখানে না থাকে দায়িত্ব, না থাকে দুঃখের ভার। কিন্তু বর্তমানে সেই চিরচেনা শৈশব ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের আড়ালে। মাঠের খেলাধুলার জায়গা দখল করেছে ভার্চুয়াল গেইম। শিশুরা এখন আর বিকালে মাঠে যায় না; বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল হাতে অনলাইন গেইমে ডুবে থাকে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন কিংবা তথ্যপ্রাপ্তি সব ক্ষেত্রেই মোবাইলের ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু এই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিশেষত শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনলাইন গেইমের প্রতি আসক্তি আজ এক ভয়াবহ সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

শিশুর স্বাভাবিক শৈশব, মানসিক বিকাশ, সামাজিকতা এবং শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শৈশবের অপমৃত্যু কথাটি আজ আর শুধু সাহিত্যিক অভিব্যক্তি নয় বরং বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। ভিডিও গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমানে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। এই আসক্তিকে সম্প্রতি মানসিক রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন ভিডিও গেম নিয়ে যথেষ্ট সচেতন।

অনেক দেশই শিশুদের ভিডিও গেমসের ওপর মনিটরিং করছে। যদিও আমাদের দেশে এখন তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু শারীরিক ক্ষতিই নয়, অনলাইন গেইম শিশুদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাচ্চারা ঝুঁকছে অ্যাডাল্ট কনটেন্টের দিকে। পাশাপাশি শিকার হচ্ছে সাইবার বুলিংয়ের। আট থেকে আঠেরো সব বয়সের বাচ্চারাই এই ধরনের গেম খেলছে। অধিকাংশ গেইমে সহিংসতা, প্রতিশোধ এবং আক্রমণাত্মক আচরণকে উৎসাহিত করা হয়। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে ‘রোবলক্স’, ‘মাইনক্রাফট’, ‘ফোর্টনাইট’, ‘কোগামা’-এর মতো অনলাইন গেম জেন আলফাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনলাইন গেম কিশোর-কিশোরীদের জন্য মোটেই ভালো নয়। এতে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্য।

ভিডিও গেমস স্ট্যাটিস্টিক অ্যাডিকশনের মতে, ৮ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ৮.৫ শতাংশ ইউজার গেমিং ডিসঅর্ডারের শিকার।

‘এলসভিয়ারের জার্নাল অব ইফেক্টিভ ডিসঅর্ডার’ নামে জার্নালের ৩২৯ নম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। এর মধ্যে ২৯ শতাংশ শিশুর মারাত্মকভাবে স্মার্টফোনের আসক্তি রয়েছে। খেলার মাঠের অভাবে ৫২ শতাংশ ও খেলার সাথীর অভাবে ৪২ শতাংশ শিশু স্মার্টফোনের দিকে আসক্ত হচ্ছে। ৭৯ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু কার্টুন বা কল্পকাহিনী দেখার জন্য, ৪৯ শতাংশ গেম খেলার জন্য, ৪৫ শতাংশ শিশু টেলিভিশন/ভিডিও দেখা বা গান শোনার জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এর ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে রূঢ়, একগুঁয়ে ও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। বাস্তব জীবনের প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায় এবং তারা কল্পনার জগতে হারিয়ে যেতে থাকে। অনেক সময় গেইমে হারলে শিশুরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, রাগান্বিত আচরণ করে কিংবা মানসিক অবসাদে ভোগে। সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও অনলাইন গেইম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে শিশুরা একসঙ্গে খেলাধুলা করে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বের শিক্ষা লাভ করত। এখন তারা একা একা মোবাইল স্ক্রিনে ডুবে থাকে। ফলে পরিবার ও সমাজের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমে যাচ্ছে।

বাবা-মায়ের সঙ্গে কথোপকথন কমে যাচ্ছে, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষাজীবনেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। অনলাইন গেইমে আসক্ত শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। অনেক শিক্ষার্থী রাত জেগে গেইম খেলার কারণে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না।

পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয় এবং ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুরা গেইম খেলার জন্য পরিবারের অজান্তে টাকা খরচ করছে কিংবা অনৈতিক পথ অবলম্বন করছে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে অনলাইন গেইমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের সামাজিক ও অপরাধমূলক ঝুঁকি। অনেক গেইমে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে, যা শিশুদের সাইবার অপরাধ, প্রতারণা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এছাড়া কিছু গেইম শিশুদের মানসিকভাবে এতটাই প্রভাবিত করে যে তারা আত্মঘাতী প্রবণতার দিকেও ধাবিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন বহু ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। প্রযুক্তি নিজে কখনও খারাপ নয়; এর সঠিক ও সীমিত ব্যবহারই মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার যখন শিশুর স্বাভাবিক শৈশব কেড়ে নেয়, তখন তা সমাজের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশুদের হাতে অবাধে মোবাইল তুলে না দিয়ে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে ব্যবহার করতে দিতে হবে। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে এবং খেলাধুলা, বই পড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে যাতে শিশুরা বাস্তব জীবনের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ক্ষতিকর ও সহিংস গেইম নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে যাতে অভিভাবক ও তরুণ প্রজন্ম অনলাইন গেইমের অপকারিতা সম্পর্কে অবগত হয়। সবশেষে একটাই প্রত্যাশা এই বঙ্গীয় বদ্বীপের শিশুরা সুস্থ জীবন ধারায় আগামীর জনসম্পদ হয়ে হেঁসে-খেলে বড় হয়ে উঠুক অনাবিল ও নির্মলভাবে।

মো. তাহমিদ রহমান

শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত