ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যের মোড়কে সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ও পুষ্টি তথ্য এখন সময়ের দাবি

ইকবাল মাসুদ
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যের মোড়কে সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ও পুষ্টি তথ্য এখন সময়ের দাবি

বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত ও মোড়কজাত খাদ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ত জীবন এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে বিস্কুট, চিপস, কোমল পানীয়, নুডলস, সস, বেকারি পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতকৃত খাদ্যের ব্যবহার আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব পণ্যের অনেকগুলোর মোড়কে এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয় যে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে পণ্যের প্রকৃত পুষ্টিমান বা স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগ এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ এসব রোগ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অথচ অধিকাংশ ভোক্তা জানতেই পারেন না যে প্রতিদিন তারা যেসব প্যাকেটজাত খাবার খাচ্ছেন, সেগুলোতে কতটা লবণ, চিনি বা চর্বি রয়েছে।

একজন ভোক্তার মৌলিক অধিকার হলো তিনি যে খাদ্য কিনছেন, সেটি সম্পর্কে সঠিক, নির্ভুল এবং সহজবোধ্য তথ্য জানা। কিন্তু বাস্তবে অনেক খাদ্যপণ্যের মোড়কে পুষ্টি তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য খুব ছোট অক্ষরে লেখা থাকে, আবার অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় না। ফলে মানুষ অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ করছে।

এই পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা ও পুষ্টি তথ্য প্রদর্শনের জন্য একটি শক্তিশালী লেবেলিং-সংক্রান্ত প্রবিধান ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি। বিশেষ করে যেসব খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম, সম্পৃক্ত চর্বি বা ট্রান্স ফ্যাট রয়েছে, সেসব পণ্যে সহজবোধ্য ভাষা ও দৃশ্যমান সতর্কবার্তা থাকতে হবে, যাতে ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। বিশ্বের বহু দেশ এরইমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে। চিলি, মেক্সিকো, ব্রাজিল, কানাডা, পেরু, কলম্বিয়া ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেলিং চালু করেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে স্পষ্ট লেবেলিং ভোক্তাদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যবহার কমায় এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরি করতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য। বিশ্বের অনেক দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি তথ্য প্রদর্শনের জন্য কঠোর আইন রয়েছে। তাই বাংলাদেশে আমদানি করা প্রতিটি খাদ্যপণ্যকে দেশের প্রযোজ্য লেবেলিং নীতিমালা ও আইন মেনে বাজারজাত করার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। কোনো খাদ্যপণ্য যদি নির্ধারিত সতর্কবার্তা বা পুষ্টি তথ্য ছাড়া দেশে প্রবেশ করে, তাহলে তা বাজারজাতের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে আমদানি পর্যায়েই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশের অনেক খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যখন বিদেশে পণ্য রপ্তানি করে, তখন তারা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে বিস্তারিত পুষ্টি তথ্য, সতর্কবার্তা এবং প্রয়োজনীয় লেবেলিং ব্যবহার করে থাকে। কারণ সেসব দেশের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং তা না মানলে পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান যখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই মানের তথ্য প্রদান করে না অথবা এমনভাবে উপস্থাপন করে যা সাধারণ ভোক্তার জন্য বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে কার্যকর তদারকি ও নজরদারির ঘাটতিও রয়েছে।

এটি শুধু নীতিগত অসঙ্গতিই নয়, বরং দেশের ভোক্তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বলেও বিবেচিত হতে পারে। বিদেশের ভোক্তা যদি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি তথ্য জানার অধিকার পায়, তাহলে বাংলাদেশের ভোক্তারাও একই অধিকার পাওয়ার যোগ্য। দেশের মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির ভোক্তা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।

যে প্রতিষ্ঠান বিদেশে আন্তর্জাতিক মানের লেবেলিং করতে সক্ষম, তারা অবশ্যই দেশের বাজারেও একই মান বজায় রাখতে পারে। সুস্থ জনগোষ্ঠী একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ অধিক কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। খাদ্যের মোড়কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা প্রদান এমনই একটি কম ব্যয়বহুল কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যেও খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক পুষ্টি সতর্কবার্তা বিষয়ক প্রবিধান প্রণয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এটি এখন শুধু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি নয়, বরং সরকারের নিজস্ব নীতিগত অঙ্গীকারেরও অংশ।

তাই এখন আর নতুন করে প্রয়োজনীয়তা প্রমাণের সময় নয়; বরং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রণীত লেবেলিং-সংক্রান্ত প্রবিধান দ্রুত চূড়ান্ত করে কার্যকর করা এবং দেশীয় ও আমদানিকৃত সব খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত মনিটরিং, আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা, ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। খাদ্যের মোড়কে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক পুষ্টি সতর্কবার্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক ভোক্তা অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অপরিহার্য উপাদান। সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটাই উপযুক্ত সময়। এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।

ইকবাল মাসুদ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত