ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রকৃতি আর কতবার সতর্ক করলে আমরা জাগব

সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকৃতি আর কতবার সতর্ক করলে আমরা জাগব

মানুষ সভ্য হয়েছে প্রকৃতির হাত ধরেই। নদী, পাহাড়, বন, সমুদ্র, বাতাস ও মাটির আশীর্বাদে গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস। অথচ সেই মানুষই আজ প্রকৃতির সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ন ও ভোগবাদী জীবনযাত্রার নামে আমরা প্রকৃতির ওপর এমন নির্মম আঘাত হেনেছি যে প্রকৃতি আজ যেন বারবার আমাদের সতর্ক করছে। কখনও তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনও ভয়াবহ বন্যা, কখনও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কখনও ঘূর্ণিঝড়, আবার কখনও এল নিনোর মতো বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃতি আমাদের সামনে সংকটের বার্তা নিয়ে হাজির হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রকৃতি আর কতবার সতর্ক করলে আমরা জাগব?

সম্প্রতি জাতিসংঘ ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা আসন্ন শক্তিশালী এল নিনো নিয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তা শুধু একটি আবহাওয়াগত পূর্বাভাস নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী মাসগুলোতে পৃথিবী আরও উষ্ণ হতে পারে, কোথাও দেখা দিতে পারে ভয়াবহ খরা, কোথাও আবার অতিবৃষ্টি ও বন্যা। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখনও এই সংকটকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে দেখছি না।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এটি নতুন কিছু নয়। শত শত বছর ধরেই পৃথিবীতে এল নিনো এসেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের এল নিনো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উদ্বেগের কারণ। কারণ এখন পৃথিবী অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস জমা হয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ওপর যখন এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

আমরা প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি ভবিষ্যৎ সমস্যা হিসেবে কল্পনা করি। মনে করি, এটি হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের নয়; এটি বর্তমানের সংকট। বাংলাদেশের মানুষ ইতোমধ্যে এর ভয়াবহ প্রভাব অনুভব করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, নদীভাঙনে মানুষ গৃহহীন হচ্ছে, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, আবার তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও যে তাপমাত্রাকে আমরা অস্বাভাবিক মনে করতাম, আজ সেটিই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শহরের কংক্রিটের জঙ্গল, গাছপালা ধ্বংস, জলাশয় ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ঢাকার মতো শহরগুলো দিনে দিনে বসবাসের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্রমজীবী মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রকৃতির সতর্কবার্তা শুধু আবহাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীববৈচিত্র্যের দ্রুত বিলুপ্তিও একটি বড় সংকেত। পৃথিবীর বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বনভূমি উজাড় হচ্ছে, নদী দূষিত হচ্ছে, সমুদ্র প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরে যাচ্ছে। পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই ফিরে আসছে। একসময় মানুষ মনে করত প্রকৃতি অসীম শক্তিশালী, তাই তাকে যতই ব্যবহার করা হোক না কেন, তার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু আজ আমরা বুঝতে পারছি, প্রকৃতিরও সীমাবদ্ধতা আছে। পৃথিবীর সম্পদ সীমাহীন নয়। আমরা যদি অবিবেচকের মতো সম্পদ ব্যবহার করতে থাকি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জলবায়ু সংকটের জন্য যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়ন ও অতিরিক্ত ভোগবাদী অর্থনীতি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ হলেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেপাল, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ওপর। এটি শুধু পরিবেশগত নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যেরও একটি বড় উদাহরণ। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনঘনত্ব এবং জলবায়ুনির্ভর অর্থনীতি এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কৃষি এখনও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকার উৎস। ফলে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় সরাসরি খাদ্য উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ আরও বাড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, যা কৃষির জন্য ক্ষতিকর। আবার কোথাও হঠাৎ অতিবৃষ্টি ও বন্যাও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে বন্যা দুই ধরনের ঝুঁকিই তৈরি হতে পারে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিশ্ব রাজনীতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক। উন্নত দেশগুলো প্রায়ই জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না। অথচ সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরও আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। আমরা প্রায়ই সব দায় উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিই। কিন্তু নিজেদের দায়িত্বও কম নয়। আমরা প্রতিনিয়ত গাছ কাটি, নদী দখল করি, জলাশয় ভরাট করি, প্লাস্টিক ব্যবহার করি এবং পরিবেশ দূষণ করি। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনেক সময় পরিবেশগত প্রভাবকে উপেক্ষা করা হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সংকট আরও তীব্র হয়।

প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। একটি গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা এসব ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সচেতনতা ছাড়া কোনো নীতিই কার্যকর হয় না। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে তরুণ প্রজন্মকে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও নাগরিক নেতা। তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে আরও কার্যকর পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ যে প্রজন্ম সংকটকে বুঝবে, তারাই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারবে। গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু দুর্যোগের খবর হিসেবে নয়, উন্নয়ন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরতে হবে। মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছালে সচেতনতা বাড়বে, আর সচেতনতা থেকেই পরিবর্তনের সূচনা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহের আগে মানুষকে সতর্ক করা গেলে বহু প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব। প্রযুক্তির উন্নয়নকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। তবে শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আজ পৃথিবী এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি। একদিকে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন, অন্যদিকে পরিবেশগত সংকটের বিস্তার। আমরা মহাকাশে অভিযান চালাচ্ছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছি; কিন্তু নিজেদের বাসযোগ্য গ্রহটিকেই নিরাপদ রাখতে পারছি না।

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত