ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আসন্ন বাজেট : ব্যয়ের অঙ্কে নয়, গুণগত পরিবর্তনের সন্ধানে

এসএম নাফিম হাসান
আসন্ন বাজেট : ব্যয়ের অঙ্কে নয়, গুণগত পরিবর্তনের সন্ধানে

বৈশ্বিক ভূরাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতির টানাপড়নে এক ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নতুন বাজেট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ এবং কর্মসংস্থানের শ্লথগতি- সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন বেশ কিছুটা চাপে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (ঘইজ) এর প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১১ ই জুন বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার রোডম্যাপের আওতায় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নই এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা (খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশের ওপরে) বিবেচনায় সরকার স্থানীয় সরবরাহ ও আমদানির ওপর উৎসে কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। উৎসে কর বৃদ্ধির কারণে ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি ও মশলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য; পাশাপাশি কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ, সিগারেট ও বিদেশি প্রসাধনসামগ্রীর দাম কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের অর্থনীতির এই সংকটকালীন মুহূর্তে এবারের বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত ‘সংকোচন ও পুনর্বিন্যাস’। অর্থাৎ যেখানে অপচয় হয় সেখানে খরচ কমানো এবং যেখানে খরচ করলে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসে, সেখানে বরাদ্দ বাড়ানো। এবারের বাজেট কত বড় হলো তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বরাদ্দকৃত টাকার গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করা। একটি টেকসই অর্থনীতির ভিত তৈরি করতে হলে আসন্ন বাজেটে প্রধানত কয়েকটি খাতে বরাদ্দ ও মনোযোগ দৃশ্যমানভাবে বাড়াতে হবে।

প্রথমত, শিক্ষা ও মানসম্মত মানবসম্পদ উন্নয়নে এই বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। বছরের পর বছর ধরে আমাদের শিক্ষা বাজেট জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের (কমপক্ষে ৪-৫) শতাংশ থেকে অনেক কম। তবে শুধু টাকার অঙ্ক বাড়ানোই শেষ কথা নয়; অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে বরাদ্দ বাড়াতে হবে মানসম্মত শিক্ষক তৈরি, কারিগরি শিক্ষা এবং মৌলিক গবেষণায়। বিশেষ করে, গবেষণা খাতে দীর্ঘদিনের অপ্রতুল বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশ এখনও বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে আছে। এই খাতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা গবেষণা খাতের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরিতে ও বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতির এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত মানুষ। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়িয়ে ভাতার পরিমাণ বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে ওয়ান-স্টপ কার্ডের মাধ্যমে সঠিক মানুষের কাছে ওএমএস বা খাদ্য সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এবারের বাজেটের মূল লক্ষটি এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত চমৎকার পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। এছাড়া কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা ও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কৃষি খাতই আমাদের সবচেয়ে বড়ো ঢাল। সার, বীজ ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি বজায় রেখে খাদ্য উৎপাদন সচল রাখা এবং কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখা আবশ্যক।

অন্যদিকে, এ বিশাল বাজেটকে কাজে লাগাতে কিছু খাতে বাজেট সংকোচন ও আবশ্যক। এতে বাজেটের ঘাটতি কমবে এবং ঋণের বোঝা হালকা হবে। এক্ষেত্রে, সর্বপ্রথম যে খাতের বাজেট হ্রাস করতে হবে তা হলো অনুৎপাদনশীল আমলাতান্ত্রিক ব্যয়। সরকারি খাতের বিলাসী গাড়ি কেনা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বড়ো বড়ো কনসালটেন্সি ফি এবং বিভিন্ন দপ্তরের অহেতুক প্রশাসনিক খরচ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কৃচ্ছ্রসাধন শুধু মুখে নয়, বাজেটের কাগজেই প্রতিফলিত হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্টগুলোতে বরাদ্দ কমাতে হবে। যে-সব মেগা প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে ঋণ বাড়াচ্ছে; কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতিতে কোনো রিটার্ন বা কর্মসংস্থান তৈরি করছে না, সেগুলোর গতি সাময়িকভাবে ধীর করতে হবে। নতুন কোনো বড়ো প্রকল্প এই মুহূর্তে হাতে না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ ‘কমাতে হবে। বছরের পর বছর ধরে অলস বসে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ‘ক্যাপাসিটি-চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে এই চুক্তিগুলো বিবেচনা করে এই খাতের ভর্তুকির অপচয় বন্ধ করার জন্য সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বাজেটে থাকা দরকার।

বাজেটের সবচেয়ে চমৎকার দিক হতে পারে এমন কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যেখানে খুব বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না, কিন্তু সুফল পাওয়া যায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের। নীতিগত পরিবর্তন এবং সামান্য বাজেট বরাদ্দেই এসব খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। যেমন- শিক্ষা খাতে শিক্ষকদের নিবিড় প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কৌশল হতে পারে। নতুন কোনো দৃষ্টিনন্দন স্কুল ভবন না বানিয়ে, বিদ্যমান শিক্ষকদের আধুনিক পেডাগজি ও দক্ষতার ওপর স্বল্প খরচে নিবিড় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক উন্নত হলে ক্লাসরুমের মান এমনিতেই বদলে যাবে। এছাড়া আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের পলিসি সাপোর্ট এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। হাইটেক পার্কের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরিবর্তে তরুণেরা যাতে নির্বিঘ্নে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করতে পারে এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কম খরচে নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পায়- তা নিশ্চিত করতে হবে। সামান্য নীতিগত সহায়তায় এটি দেশের লাখ লাখ তরুণকে স্বাবলম্বী করবে এবং বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এনে দেবে- এছাড়াও বাজেটের বরাদ্দের কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে বড় ও ব্যয়বহুল বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার চেয়ে গ্রাম ও শহর অঞ্চলের “কমিউনিটি-ক্লিনিক” বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগ নির্ণয়ের মৌলিক কিট ও ঔষধ সরবরাহ করা। রোগ বড় হওয়ার আগেই যদি প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যায় তাহলে নাগরিকদের পকেটের এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা চিকিৎসাজনিত ব্যয় বেঁচে যায়।

এসএম নাফিম হাসান

শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত