প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ জুন, ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান, গবেষণা ও নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ছবি। এটি এমন একটি সময়, যখন একজন শিক্ষার্থী নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু এই স্বপ্নের উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা। ক্লাস, পরীক্ষা ও শিক্ষাজীবনের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত লড়াই করছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার সঙ্গে। ধীরে ধীরে এটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য এক নীরব মানসিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়- ‘পড়াশোনা শেষ করে কী করবে?’ প্রথমদিকে প্রশ্নটি সাধারণ মনে হলেও অনার্সের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে এটি মানসিক চাপের অন্যতম বড় উৎস হয়ে ওঠে। দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই তুলনায় সীমিত। ফলে চাকরি পাওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যেই তীব্র উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। এসব শিক্ষার্থীর পরিবারের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের পরও যদি কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান না মেলে, তাহলে তাদের মনে হয় এত বছরের পরিশ্রম ও সময় যেন ব্যর্থ হয়ে গেল। গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এ ধরনের চাপ অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, কারণ সমাজ এখনও পুরুষদের ওপর পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহনের প্রত্যাশা বেশি করে।
শুধু কর্মসংস্থান নয়, সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশাও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চাপ থাকে। বাবা-মা সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তার প্রতিদান দেওয়ার তাড়নাও অনেককে মানসিক অস্থিরতায় ফেলে।
অন্যদিকে সমাজে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা মানেই সরকারি বা কর্পোরেট চাকরি পাওয়া। যদি কেউ সেই পথে সফল না হয়, তাহলে তাকে ব্যর্থ হিসেবে দেখা হয়। ফলে চাকরিকেই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের হতাশা ও অনিশ্চয়তাকে আরও তীব্র করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে সমবয়সীদের সাফল্যের গল্প দেখে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের পিছিয়ে পড়া মনে করে। বাস্তবে একজন মানুষের সাফল্যের পেছনের সংগ্রাম সবার চোখে পড়ে না; দৃশ্যমান হয় শুধু অর্জনের অংশটুকু। ফলে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই আত্মমর্যাদাবোধের সংকট, হতাশা ও উদ্বেগে ভুগতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক চাপের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, গবেষণা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারা, শিক্ষকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়া, নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ সীমিত থাকা, বন্ধু বা সহপাঠীদের কাছ থেকে অবহেলার শিকার হওয়া- এসব বিষয়ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থার অভাব। দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও সনাতন ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতির প্রাধান্য রয়েছে। অথচ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র, সংগীত, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি- প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের যদি শুরু থেকেই ব্যবহারিক জ্ঞান, ইন্টার্নশিপ ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য আরও প্রস্তুত হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার এই বিচ্ছিন্নতা অনেক শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি অর্জনের পরও কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়। ফলে হতাশা ও অনিশ্চয়তা অনেকের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। কেউ পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে, কেউ বাধ্য হয়ে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে এসে অন্য পেশায় যুক্ত হয়, কেউ দীর্ঘদিন বেকারত্বের সঙ্গে লড়াই করে, আবার কেউ চরম হতাশায় আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে।
বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭৭ জন শিক্ষার্থী মানসিক চাপ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত হতাশার কারণে আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, ৬ জন মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবং ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একইভাবে সাম্প্রতিক ‘ইউথ ওয়েলনেস সার্ভে ২০২৬’-এর তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপে জীবনযাপন করছে।
মোছা. মায়া আক্তার
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়