ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

একজন মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু : সভ্যতার মুখে এক নির্মম প্রশ্ন

জুবাইয়া বিন্তে কবির
একজন মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু : সভ্যতার মুখে এক নির্মম প্রশ্ন

মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত সম্পর্কের ইতিহাস। আগুন আবিষ্কার, চাকা নির্মাণ, নগর গড়ে তোলা কিংবা প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি এসবের মধ্যেও মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। একটি শিশু যখন পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার প্রথম আশ্রয় হয় মায়ের বুক। সেই বুকের উষ্ণতা, সেই নির্ঘুম রাত, সেই নিঃস্বার্থ ত্যাগের ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে একজন মানুষের জীবন, ব্যক্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ। অথচ সময়ের নির্মম পরিহাসে অনেক মা-বাবাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়ে পড়েন অবহেলিত, নিঃসঙ্গ এবং অদৃশ্য। চারপাশে মানুষ থাকে, কিন্তু পাশে কেউ থাকে না; ঘর থাকে, কিন্তু আপনজনের স্পর্শ থাকে না; জীবন থাকে, কিন্তু জীবনের আনন্দ থাকে না। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকার একটি বহুতল ভবনের একটি ফ্ল্যাট। দরজার ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। দিন কেটে গেছে, রাত কেটে গেছে, কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি। অবশেষে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখতে পায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একজন বৃদ্ধা মায়ের পচাগলা লাশ পড়ে আছে। মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েকটি দিন। জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে ছিল না কোনো সন্তান, কোনো স্বজন, কোনো পরিচিত মুখ। এই মৃত্যু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গণ্ডি অতিক্রম করে আমাদের সময়ের নৈতিক সংকট, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মানবিকতার ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ার এক নির্মম দলিল হয়ে উঠেছে। একজন মায়ের পচাগলা লাশের চেয়েও ভয়ংকর ছিল তার দীর্ঘ অপেক্ষা সন্তানের জন্য, একটি ফোনকলের জন্য, একটি খোঁজ নেওয়ার জন্য, হয়তো একটি মাত্র বাক্যের জন্য ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ সেই অপূর্ণ অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

নূরজাহান বেগম নামটি আজ একটি প্রতীক। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের অসংখ্য মায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেই সব মায়েদের, যারা নিজের জীবনকে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন। যারা নিজের সুখ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, আরাম সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন। কিন্তু বার্ধক্যের প্রান্তে এসে তাদের অনেকেই নিঃসঙ্গতা, অবহেলা এবং মানসিক শূন্যতার শিকার হন। শিক্ষিত সমাজের সামনে একটি নিষ্ঠুর প্রশ্ন : ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করেছে একটি বিষয়। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা (যুগ্ন সচিব), একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, আরেকজন শিক্ষকতা জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষা কি শুধু পেশাগত সাফল্যের জন্য, নাকি মানুষ হওয়ার জন্যও? যদি শিক্ষা মানবিকতা সৃষ্টি না করে, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়?

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাওয়া মানবজীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। একজন মা, যিনি একসময় সন্তানদের পৃথিবীর কেন্দ্র ছিলেন, তার জীবনের শেষ অধ্যায় যদি নিঃসঙ্গতা দিয়ে শেষ হয়, তবে সেটি শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক ব্যর্থতাও। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং একজন শিক্ষিকা। অর্থাৎ পরিবারটি শিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের দিক থেকে সমাজের উচ্চস্তরে অবস্থান করছিল। কিন্তু এই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে- সাফল্য ও মানবিকতা সবসময় সমার্থক নয়।

পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটি কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? একসময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক শক্তি। দাদা-দাদি, নানা-নানি, মা-বাবা ও সন্তানরা একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন। আধুনিক নগরায়ণ সেই কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নতুন কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোও গড়ে তুলতে পারিনি। বিশ্বের বহু দেশে প্রবীণদের একাকীত্বকে এখন ‘Silent Epidemic’ বা নীরব মহামারি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একাকীত্ব শুধু মানসিক কষ্টই বাড়ায় না; এটি হৃদরোগ, বিষণ্ণতা, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে। আমাদের সন্তানদের আমরা কী শেখাচ্ছি? আজকের শিশুরা প্রতিযোগিতা শিখছে, প্রযুক্তি শিখছে, ক্যারিয়ার গড়া শিখছে। কিন্তু তারা কি সহানুভূতি শিখছে? তারা কি শিখছে বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে? সমাজ হিসেবে আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা লালন করেছি উচ্চশিক্ষিত মানেই ভালো মানুষ। বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে, ডিগ্রি জ্ঞান দিতে পারে, দক্ষতা দিতে পারে, পেশাগত সাফল্য দিতে পারে; কিন্তু মানবিকতা শেখানোর দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের। একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হতে পারেন, কিন্তু যদি তার হৃদয়ে মমতা না থাকে, তবে সেই অর্জনের নৈতিক মূল্য সীমিত হয়ে যায়।

একজন মা সন্তানের জন্য কী করেন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তিনি রাত জাগেন, কাঁদেন, প্রার্থনা করেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেন। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানকে উৎসর্গ করেন। একটি সন্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে যে পরিমাণ ত্যাগ লুকিয়ে থাকে, তার পূর্ণ মূল্য কখনোই পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অন্তত সম্মান, যত্ন এবং ভালোবাসা তো দেওয়া সম্ভব। সমাজে আমরা অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কথা বলি। কিন্তু ভালোবাসার দারিদ্র্য আরও ভয়ংকর। একজন বৃদ্ধ মানুষের কাছে হয়তো খাবার আছে, ওষুধ আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে; কিন্তু যদি কথা বলার মানুষ না থাকে, তবে তার জীবন গভীর শূন্যতায় ডুবে যায়। একাকীত্ব মানুষের আত্মাকে ক্ষয় করে দেয়।

নূরজাহান বেগমের ঘটনা আমাকে আমার নিজের পরিবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি একজন নারী, একজন কন্যা। আমার মা-বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ভাই হাজার মাইল দূরে থাকলেও প্রতিদিন মা-বাবার খোঁজ নেন। ঢাকায় থাকা আমার ছোট বোনও সর্বদা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত