প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ থেকেই যখন ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তখন সীমান্তে ভারতের কিছু একপাক্ষিক কর্মকাণ্ড ও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর নতুন করে অস্বস্তি ও তিক্ততার ছায়া ফেলছে। গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার ছুটির সুযোগে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বেশকিছু মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বা পুশইন করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। একইসঙ্গে পরিচয় যাচাইয়ের নামে অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হোল্ডিং সেন্টারে রেখে মানসিক চাপ সৃষ্টির খবরও এসেছে।
স্বাভাবিকভাবেই এই সংবেদনশীল সীমান্ত সংকট দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু আস্থার সংকটই তৈরি করছে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর কথিত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার যে রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান তৎপরতা তারই ধারাবাহিকতা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে কিংবা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ছাড়া এভাবে একপাক্ষিক পুশইন করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বলা বাহুল্য, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ কখনোই যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ও পরিচয় নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য দেশের কোনো নাগরিককে নিজের ভূখণ্ডে গ্রহণ করতে পারে না। বরং প্রতিবেশী দেশের এ ধরনের চেষ্টা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিতকেই দুর্বল করে তুলবে। এ তিক্ততায় কারও কোনো লাভ হবে না। অবশ্য ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং সীমান্তরক্ষা বাহিনী তাড়াহুড়ো করে বা যত্রতত্র জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ করার সনাতন পদ্ধতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। নয়াদিল্লির এ অবস্থান প্রমাণ করে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি একইসঙ্গে গভীর মানবিক, ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গেও জড়িত। অতীতে এ ধরনের পুশইনের কারণে দুই দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, যার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমরা মনে করি, বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কে কোনো কারণে যেন ফাটল না ধরে, সে বিষয়ে উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একইসঙ্গে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে ঢাকাকে অত্যন্ত দৃঢ় ও দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ ও অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে বলে মনে করি আমরা। পাশাপাশি দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। দুই দেশের সরকার পারস্পরিক যুক্তি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং মানবিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে এই সংবেদনশীল ইস্যুটির একটি মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে, এটাই প্রত্যাশা।