ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দূষণের গ্রাসে ঐতিহ্যের বুড়িগঙ্গা

খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি
দূষণের গ্রাসে ঐতিহ্যের বুড়িগঙ্গা

প্রাচীন নগর ঢাকা অবস্থিত বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। মুঘল আমলে সুবাদার ইসলাম খাঁ বাংলার রাজধানীর পত্তন করেছিলেন বুড়িগঙ্গার তীরে এই ঢাকায়। বুড়িগঙ্গাকে ভালোবেসে সুবাদার মুকাররম খাঁ সৌন্দর্যবর্ধন করেছিলেন। তার শাসনামলে শহরের যেসব অংশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, সেখানে প্রতি রাতে আলোক সজ্জা করা হতো। এছাড়া নদীর বুকে অসংখ্য নৌকাতে জ্বলতো ফানুস বাতি। ১৮০০ সালে টেইলর বুড়িগঙ্গা নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন- বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো।

অথচ ভেনিসের সৌন্দর্যদানকারী বুড়িগঙ্গা আর নেই। এখানে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ নেই, মাছ কিংবা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে থাকাও কঠিন। এ নদী পরিণত হয়েছে রীতিমতো বিষাক্ত বর্জ্যরে বহমান আধারে। এসবের জন্য দায়ী আমরাই। এখানে প্রতিদিন ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি শিল্পবর্জ্যসহ কাঁচাবাজার, গৃহস্থালি ও হাসপাতালের বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরের গৃহস্থালি ও অন্যান্য শিল্প থেকে প্রতিদিন ৭ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ অপরিশোধিত কঠিন বর্জ্য বিভিন্ন সংযোগ খালের মধ্য দিয়ে গিয়ে বুড়িগঙ্গাতেই পড়ছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর অন্যতম বুড়িগঙ্গার মাত্র ছয় কিলোমিটারের মধ্যে ২৫১টি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্য এসে মিশছে। এ নদীর দূষণের ৩০-৪০ শতাংশই হচ্ছে এসব পাইপলাইনের মধ্যে দিয়ে।

এক গবেষণায় জানা গিয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীর বরাবর ২৫৭টি বর্জ্য ফেলার পয়েন্ট বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণের অন্যতম কারণ। এর মধ্যে ডান তীরে ১৪৮টি এবং বাম তীরে রয়েছে ১০৯টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লুএইচও) মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর মধ্যে একটি বুড়িগঙ্গা।

প্রতিদিন শহরের ৬০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি বিষাক্ত বর্জ্য এ নদীর পানিতে ফেলা হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পবর্জ্য। নদীতে পড়া বর্জ্যর ৬০ শতাংশ বর্জ্যই শিল্প খাতের। অথচ চাইলেই এই বর্জ্য পদার্থগুলো পরিশোধন করে নদীতে ফেলা যায়। আমেরিকার ইরি নামক হ্রদের কথা উদাহারণ স্বরুপ বলাই যায়। এই হ্রদের আশপাশে গড়ে উঠেছিল ডিটারজেন্ট তৈরির কারখানা।

১৯৫০-৭০ এর দশকে শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন এবং কৃষিক্ষেত্র থেকে আসা রাসায়নিক পদার্থের কারণে হ্রদটি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছিলো এবং হ্রদের সমস্ত জলজ প্রাণীও মারা গিয়েছিলো। ফলে ইরি হ্রদকে মৃত হ্রদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিলো। এই ঘটনার পর আমেরিকা সরকার আইন করে বর্জ্য পানি পরিশোধন ছাড়া হৃদে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়। এরপর আশ্চর্যজনকভাবে ইরি হৃদে আবার প্রাণীর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। কঠোর আইন বাস্তবায়ন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে সেই হ্রদকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাজ্যের টেমস নদী এতটাই দূষিত হয়েছিল যে একে কার্যত ‘জীবনহীন নদী’ বলা হতো। শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের কারণে নদীতে মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

কঠোর পরিবেশ আইন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীটি পুনরুজ্জীবিত হয়। বর্তমানে টেমসে শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া ইউরোপের রাইন নদী, দক্ষিণ কোরিয়ার চিয়ংগেচন খাল, সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর নদী জলন্ত উদাহারন। তাহলে আমাদের বুড়িগঙ্গা কেন নয়?

বুড়িগঙ্গার পানি রীতিমতো বিষে পরিণত হয়েছে, যা আদৌ সেবন তো দূরের কথা ব্যবহারযোগ্যও নয়। এছাড়া যেখানে ডিজলভড অক্সিজেন থাকার কথা প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলিগ্রামের বেশি সেখানে বর্তমানে বুড়িগঙ্গার পানিতে কোনো ডিজলভড অক্সিজেন নেই বললেই চলে। ট্যানারি, ডাইং কারখানা এবং বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার কারণে পানিতে উচ্চমাত্রায় ক্রোমিয়াম, সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া আধুনিক ল্যাব টেস্টে পানিতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল এবং চঋঅঝ (যা সহজে ধ্বংস হয় না)-এর মতো উপাদানও মিলেছে। ঢাকার হাজারীবাগ, সদরঘাট ও পোস্তগোলা সংলগ্ন এলাকার পানি খালি চোখেই আলকাতরার মতো কালো কিংবা গাঢ় ধূসর দেখায়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই পানি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা আশেপাশের বাসিন্দাদের শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম কারণ। এছাড়া বুড়িগঙ্গার তলদেশে প্রায় ৭/৮ ফুট পলিথিনের স্তরও জমে গেছে। এই পলিথিনগুলো নদীর গভীরতা বাড়াতে ব্যবহার জরা ড্রেজিং মেশিনগুলো বিকল করে দেয়। পলিথিন আর প্লাস্টিকের বোতলের স্তূপের কারণে মাছ তাদের ডিম পাড়ার বা বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক জায়গা পায় না। এর ফলে নদীর দেশীয় মাছের প্রজাতিগুলো চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিশ্বের অনেক দূষিত নদ, হ্রদ মৃত অবস্থা থেকে কঠোর পরিবেশ আইন, নাগরিক দায়িত্ব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে। একদিন যে বুড়িগঙ্গার বুকে ভাসত ফানুসের আলো, আজ সেখানে ভাসে বর্জ্যের স্তূপ। তবুও আশা ফুরিয়ে যায়নি। আবারও স্বচ্ছ জলে, মাছের ঝাঁকে আর প্রাণের উচ্ছ্বাসে মুখর হতে পারে বুড়িগঙ্গা। ইতিহাসের নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে না দিয়ে নতুন জীবনের সুযোগ দেওয়ার সময় এখনই। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ঐতিহ্য ও পরিবেশকে সংরক্ষণ করা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একদিন হয়তো বুড়িগঙ্গা শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।

খাদিজাতুল খোরশেদ খুশি

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইডেন মহিলা কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত