ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিষাক্ত ফলমূল ও বিপন্ন জনস্বাস্থ্য : আমাদের সচেতনতা ও করণীয়

ওসমান গনি
বিষাক্ত ফলমূল ও বিপন্ন জনস্বাস্থ্য : আমাদের সচেতনতা ও করণীয়

এখন চলছে মৌসুমি ফলমূলের পুরো সৃজন, আর এই ফলমূলের সৃজনকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দেদারসে বাজারে কেমিক্যালযুক্ত ফলমূল বাজারে বিক্রি করছে। যা আমাদের মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। প্রকৃতির এক অনন্য ও পুষ্টিকর দান হলো ফলমূল। ভিটামিন, খনিজ এবং নানা প্রকার খাদ্যপ্রাণে ভরপুর ফল আমাদের শরীরকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সেই স্বাস্থ্যকর ফলমূলই মানবদেহের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের চকচকে, দৃষ্টিনন্দন ফলের আড়ালে লুকিয়ে থাকছে মারাত্মক রাসায়নিকের বিষ। ফরমালিন, কার্বাইড, ইথোফেন বা ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভের যথেচ্ছ ব্যবহারে আজ সাধারণ মানুষের পাত থেকে পুষ্টির বদলে বিষ নেমে আসছে। এই বিষাক্ত ফল খাওয়ার ফলে সাময়িক পেটের পীড়া থেকে শুরু করে ক্যান্সার, লিভার বা কিডনি বিকলের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাণঘাতী ব্যাধি ক্রমশ মহামারি আকার ধারণ করছে। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে এই রাসায়নিকযুক্ত ফলমূলের ব্যবহার রোধ করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আমাদের দেশের বাজারগুলোতে সারাবছরই হরেকরকম ফলের সমারোহ থাকে। গ্রীষ্মের আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু থেকে শুরু করে শীতের কমলা, আপেল কিংবা বারোমাসি কলা ও পেঁপে, সবই মানুষের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা মেটায়। কিন্তু অতি মুনাফালোভী একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কারণে এই প্রাকৃতিক সম্পদ এখন আতঙ্কের কারণ। ফল দ্রুত পাকানো, পচন রোধ করা এবং ফলকে আকর্ষণীয় রঙে রাঙিয়ে তোলার জন্য দেদারসে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। গাছ থেকে অপক্ব ফল পেড়ে তা কৃত্রিমভাবে পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা অত্যন্ত সাধারণ একটি চিত্র। এই কার্বাইড যখন ফলের আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসে, তখন অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি হয়, যা ফলকে দ্রুত পাকিয়ে দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ফলের নিজস্ব পুষ্টিগুণ ও স্বাদ তো নষ্ট হয়ই, উপরন্তু তা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

ফলকে দীর্ঘদিন সতেজ ও পচনমুক্ত রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন বা টেক্সটাইল ডাই। ফরমালিন মূলত গবেষণাগারে বা লাশ সংরক্ষণে ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি শরীরে প্রবেশ করলে তা লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ বাজারের আম, মাল্টা, আপেল বা আঙুরের গায়ে এই রাসায়নিকের প্রলেপ দিয়ে মাসের পর মাস তা তাজা রাখার অপচেষ্টা চলছে। সাধারণ ক্রেতারা বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং বেশি দামে এই বিষ কিনে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের মুখে তুলে দিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মায়েরা এই রাসায়নিকযুক্ত ফল খাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং গর্ভস্থ সন্তানের নানা জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রাসায়নিকের এই ভয়াবহতা শুধু তাৎক্ষণিক শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিকযুক্ত ফল খাওয়ার ফলে শরীরে ক্রনিক টক্সিসিটি বা দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া তৈরি হয়। এর ফলে রক্তস্বল্পতা, পাকস্থলীর আলসার, হৃদরোগ এবং সবশেষে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধি বাসা বাঁধে। ইদানীং আমাদের সমাজে অল্প বয়সেই কিডনি বিকল হওয়া বা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে এই ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাদ্যের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ফল খাওয়ার মূল উদ্দেশ্য যেখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, সেখানে কৃত্রিম বিষাক্ত ফলের কারণে মানুষ উল্টো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে, যা একটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে প্রথমত ক্রেতা বা সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বাজার থেকে ফল কেনার সময় আমাদের কিছু বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফল এবং রাসায়নিক দিয়ে পাকানো ফলের মধ্যে কিছু স্পষ্ট পার্থক্য থাকে। কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফলগুলো দেখতে অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল এবং এক রঙের হয়। যেমন- রাসায়নিক দিয়ে পাকানো আমের পুরো শরীর একসাথে হলুদ হয়ে যায়, কিন্তু বোঁটার চারপাশটা অনেক সময় সবুজ বা ফ্যাকাশে থাকে। প্রাকৃতিকভাবে পাকা ফলের রঙে একটা স্বাভাবিক অসমতা থাকে এবং তার একটি মিষ্টি সুঘ্রাণ থাকে, যা রাসায়নিকযুক্ত ফলে পাওয়া যায় না। এছাড়া, মাছি বা অন্যান্য কীটপতঙ্গ রাসায়নিকযুক্ত ফলের ধারেকাছে সহজে বসে না। ফল কেনার সময় কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য না দেখে এই ছোটখাটো বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে অনেকখানি নিরাপদ থাকা সম্ভব।

ফল খাওয়ার পূর্বে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত বা পরিষ্কার করাও সচেতনতার একটি বড় অংশ। বাজার থেকে আনা ফল সরাসরি না খেয়ে তা খাওয়ার অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগে পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে হালকা গরম পানিতে সামান্য লবণ বা ভিনেগার মিশিয়ে ফল ধুয়ে নিলে ফলের উপরিভাগে থাকা কীটনাশক বা রাসায়নিকের তীব্রতা কিছুটা কমানো যায়। আপেল বা নাশপাতির মতো ফলের খোসা ফেলে খাওয়া এবং আঙুর বা লিচু খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদিও এই ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো ফলকে শতভাগ রাসায়নিকমুক্ত করতে পারে না, তবুও তা বিষক্রিয়ার মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

তবে কেবল সাধারণ মানুষের সচেতনতাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত ফল উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ এই সংকটের অবসান ঘটবে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানোর বিরুদ্ধে দেশে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত বাজারে অভিযান পরিচালনা করা, আড়তগুলোতে রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। মুনাফার লোভে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অপসংস্কৃতিকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে।

একই সঙ্গে, ফল চাষি ও বাগান মালিকদের পর্যায়েও সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি দূর করা প্রয়োজন। অনেক সময় কৃষকরা অজ্ঞতাবশত বা মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপে পড়ে গাছে অতিরিক্ত কীটনাশক বা হরমোন প্রয়োগ করেন। নিরাপদ ফল চাষের আধুনিক পদ্ধতি, সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তা সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষকদের সরকারিভাবে উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত করতে হবে। হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজের সুবিধা বৃদ্ধি করলে ব্যবসায়ীরা পচনের ভয়ে ফলে রাসায়নিক মেশানোর প্রবণতা থেকে সরে আসবে। প্রাকৃতিকভাবে ফল সংরক্ষণের প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সরকারের একটি অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

গণমাধ্যমেরও এই বিষয়ে একটি বিরাট সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে রাসায়নিকযুক্ত ফলের ক্ষতিকর দিক এবং তা চেনার উপায় নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার। যখন সাধারণ মানুষ এই বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন হবে এবং রাসায়নিকযুক্ত ফল বর্জন করা শুরু করবে, তখন ব্যবসায়ীরাও বাধ্য হয়ে ভালো মানের ফল বাজারে আনবে। সুস্থ সমাজ ও সবল প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে আমাদের খাদ্যতালিকা থেকে এই বিষ দূর করতেই হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ফলমূল আমাদের বেঁচে থাকার এবং সুস্থ থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ। পুষ্টির এই প্রাকৃতিক উৎসকে যারা বিষে পরিণত করছে, তারা মানবতার শত্রু।

রাসায়নিকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নাগরিক জীবনকে রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা- সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ক্ষতিকর কেমিক্যালযুক্ত ফল খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সতর্কতা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, রোগমুক্ত এবং নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে পারব। বাজারে গিয়ে চকচকে ফলের মোহে না পড়ে, সচেতন চোখ ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে ফল কেনাই হোক আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস।

ওসমান গনি

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত