প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ জুন, ২০২৬
মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক শর্ত খাদ্য। তবে শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই খাদ্য হতে হবে নিরাপদ, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। কারণ একটি জাতির সুস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার খাদ্যের গুণগত মানের ওপর। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর ৭ জুন পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস।
?খাদ্য নিরাপত্তা বলতে এমন খাদ্যকে বোঝায় যা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ভোগের প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্যসম্মত ও ঝুঁকিমুক্ত থাকে। বৈশ্বিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ঋধৎস ঃড় ঋড়ৎশ’ বা ‘খামার থেকে থালা’ নীতি। অর্থাৎ, বীজ বোনা থেকে শুরু করে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা বজায় রাখা। খাদ্যে ক্ষতিকর জীবাণু, রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু কিংবা ভেজালের উপস্থিতি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষক, কৃষক ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বজুড়ে অনিরাপদ ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে, যেখানে কমবয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা অসুস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স্কদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ এই বয়সের শিশুরা হলেও সামগ্রিক খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়া মোট রোগীর সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই শিশুরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দূষিত খাবার ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন- ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস এ, টাইফয়েড এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার (যেমন- সালমোনেলা ও ই. কোলাই) সংক্রমণ এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর প্রধান কারণ। অনিরাপদ খাদ্যের অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। গবেষণায় প্রাপ্ত, ২০২১ সালে খাদ্যবাহিত রোগের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৬৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ধান, মাছ, সবজি ও পোলট্রি উৎপাদনে বিশ্বে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়লেও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। দেশে ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, মাছে অননুমোদিত সংরক্ষণকারী পদার্থ এবং মসলা ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এছাড়া দেশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন বা কোল্ড চেইন (ঈড়ষফ ঈযধরহ) ব্যবস্থার অভাবে প্রচুর খাদ্য নষ্ট হয় এবং পচন রোধে ব্যবসায়ীরা অনৈতিকভাবে রাসায়নিক ব্যবহার করেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতার কারণে এই ভেজাল পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের ?কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতও ঝুঁকিতে। অধিক ফলনের আশায় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং পোলট্রি ও মৎস্য খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের ফলে মানবদেহে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (অগজ) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগ তৈরি হচ্ছে। তাই বিশ্বব্যাপী এখন ‘ঙহব ঐবধষঃয’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে- যেখানে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও খাদ্যের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করেছে। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি জরুরি। একই সঙ্গে পণ্য কেনার সময় মেয়াদ ও মানচিহ্ন দেখে কেনার বিষয়ে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে- ‘ওভ রঃ রং হড়ঃ ংধভব, রঃ রং হড়ঃ ভড়ড়ফ’ (যা নিরাপদ নয়, তা খাদ্যই নয়)। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সংগ্রাম শুধু একটি দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেই হবে না, একে প্রতিদিনের অঙ্গীকার বানাতে হবে। কারণ নিরাপদ খাদ্য মানেই সুস্থ জীবন আর সুস্থ জীবনই একটি উন্নত দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তাসনিয়া তাবাচ্ছুম
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ