ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নিরাপদ শৈশবের জন্য পেডোফিলিয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি চাই

মো. তাহমিদ রহমান
নিরাপদ শৈশবের জন্য পেডোফিলিয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি চাই

শিশু একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা প্রতিটি সভ্য সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। একটি সভ্যরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা শিশুর শৈশব। অথচ বাংলাদেশে সেই শৈশব আজ ভয়, আতঙ্ক ও যৌন সহিংসতার ছায়ায় ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রতিদিন জাতীয় দৈনিকের পাতায় শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, যৌন নিপীড়ন কিংবা নির্যাতনের খবর যেন এক নির্মম স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। শুধু কন্যাশিশু নয়, বালক শিশুরাও বিকৃত যৌনাচারের শিকার হচ্ছে। সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পেডোফিলিক মানসিকতার মানুষগুলো শিশুদের সরলতা, নির্ভরতা ও অসহায়ত্বকে ব্যবহার করছে ভয়াবহ অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে। এই অপরাধ শুধু একটি শিশুর শারীরিক ক্ষতিই করে না, বরং তার মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংস করে দেয়। পেডোফিলিক বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি প্রাক-কৈশোর শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ, তাড়না বা লালসা অনুভব করেন। ছেলে শিশুরা যে সহজেই যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে, সেটি অনেকের ধারণাতেই নেই। এই সুযোগটাই নেয় ছদ্মবেশী যৌন নির্যাতক বা পেডোফিলিকরা। পেডোফিলিয়া বা শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ হচ্ছে কিছু মানুষের বিকৃত রুচি। যাদের আমরা বিকারগ্রস্তও বলতে পারি। আমাদের সমাজে পেডোফিলিয়া বা শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ ধারণ করেছে। পেডোফাইল পুরুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে সমাজে বেড়েই চলেছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রির সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ছয়জন ছেলেশিশুর মধ্যে কমপক্ষে একজন যৌন হয়রানির শিকার। মেয়েশিশুদের মধ্যে এই হার প্রতি চারজনে একজন। পেডোফিলিয়া শুধু যৌন নিপীড়ন না, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকৃত একটি মানসিক রোগ। এটি একরকম ‘অসুস্থতা’ হলেও এর জন্য কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিদিনই খবরের কাগজ খুললেই কোনো না কোনো শিশু নির্যাতনের সংবাদ পড়ে আঁতকে উঠতে হয়। যদিও সংবাদপত্রে কতটা আসে সেটা আরেক বিরাট গবেষণার বিষয়। দ্বিমত করছি না যে পেডোফিলিয়া নিয়ে কথা বলা অন্যান্য যৌন নির্যাতনের মতোই খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। কিন্তু এই ভয়াবহতা থেকে একটি শিশুকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই ব্যাপক প্রচারণা এবং সতর্কতা দরকার- সেই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ মনে হয় কেউই করবেন না। কিন্তু তারপরও আরও অনেক মানসিক সমস্যা নিয়ে আজকাল অনেক আলোচনা টিভি, সংবাদপত্র ইত্যাদিতে দেখলেও শিশুর যৌন নির্যাতন নিয়ে কথা বলাটা মনে হয় এখনও ‘ট্যাবু’! বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের শিশু সুরক্ষার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে দেশে মোট ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ বছরের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৪৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এইচআরএসএসের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশে ৫১৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। এতে ৪ মাসে দেশে ১৯৫ জন প্রাণ হারিয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কমপক্ষে ২৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৮ জন, যাদের মধ্যে ৩০ (৪৪%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন। দেশে ধর্ষণের পর শিশু হত্যার ঘটনা বাড়ছে। সারা দেশে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩জন শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে এক একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া শৈশব, এক একটি পরিবারের আজীবনের দুঃস্বপ্ন।

গত বছরের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে সর্বত্র। বিচারিক আদালত প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি এখনও আপিলের ধাপে ঝুলে আছে। এরপর গত ১৯ মে সকালে আবারও শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের খবরে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। প্রতিবেশীর বিকৃতির শিকার হয়ে জীবন দিতে হয় এই ছোট্ট শিশুকে। তবে এই নিষ্ঠুরতার তালিকা এখানেই শেষ নয়। হয়ত আমাদের আশপাশে এমন অনেক আছিয়া, রামিসা আছে যাদের সঙ্গে অন্যায় ঘটলেও তার কিছুই আমরা জানি না। আমাদের সমাজে পেডোফিলিয়া বা শিশুকাম এখন এমন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, ভাগ্য খুব ভালো না হলে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে প্রায় সবাইকে এই বিকৃত পেডোফাইলদের হাতে পড়তে হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি; কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় ও বিচারহীনতার কারণে বহু পরিবার অভিযোগই করে না। যা রামিসার বাবার আর্তনাদ থেকে আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বাড়ছে এই অপরাধ? এর পেছনে শুধু ব্যক্তির বিকৃত মানসিকতা নয়, রয়েছে সামাজিক নীরবতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দীর্ঘ ছায়া। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটার পর সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ভেঙে পড়ে। শুধু আইনের দুর্বলতা নয়, আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বও এই অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আমরা শিশুদের যৌন নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করি। পরিবারে ‘গুড টাচণ্ডব্যাড টাচ’ শিক্ষা এখনও সাধারণ চর্চা নয়। ফলে শিশুরা অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আবার বুঝলেও ভয় বা লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না। এই নীরবতা পেডোফাইলদের সবচেয়ে বড় শক্তি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। সংবিধান, শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সবই আছে; কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি প্রকট। আইন থাকলেই হবে না, প্রয়োজন জিরো টলারেন্স নীতি। শিশু ধর্ষণ ও পেডোফিলিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে এমন বার্তা দিতে হবে যেন কোনো অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা অর্থের জোরে পার না পায়। শিশু যৌন নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কাউন্সেলিং ও যৌন নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা জরুরি। আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে এই নীরবতা ভাঙতেই হবে। কারণ তথ্য গোপন রাখা কখনোই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। পেডোফাইল অপরাধীদের জন্য জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। যারা শিশু যৌন নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, তাদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। স্কুল, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কোচিং সেন্টার কিংবা শিশুদের সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের আগে বাধ্যতামূলক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই প্রয়োজন।

প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। পেডোফিলিয়া কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তাই এখনই সময় ‘নিরাপদ শৈশবের জন্য পেডোফিলিয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি’ বাস্তবায়নের। কারণ একটি শিশুর কান্না শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি।

মো. তাহমিদ রহমান

শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত