ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

একীভূত শিক্ষা : সহানুভূতি নয়, অধিকার

সানজিদা স্বর্ণা
একীভূত শিক্ষা : সহানুভূতি নয়, অধিকার

সব শিশুর শেখার ক্ষমতা এক নয়, কিন্তু শেখার অধিকার সবার সমান। তবুও আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের একই মানদণ্ডে বিচার করতে অভ্যস্ত। যে শিশু একটু ভিন্নভাবে শেখে, একটু ধীরে বোঝে কিংবা অন্যদের মতো আচরণ করে না, তাকে আমরা প্রায়ই ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখতে শুরু করি। অথচ আধুনিক শিক্ষা গবেষণা বলছে, সব শিশুই শিখতে পারে যদি তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কারণ প্রতিটি শিশুর মধ্যেই সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

বিশ্বব্যাপী এখনও অসংখ্য শিশু শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। সম্প্রতি ইউনেস্কোর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি পাঁচজন শিশু-কিশোরের মধ্যে একজন শিক্ষার মূলধারার বাইরে রয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে নয়, বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকটকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। শিক্ষা থেকে কোনো শিশুর বাদ পড়ে যাওয়ার এই বাস্তবতাই বিশ্বব্যাপী একীভূত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা থেকেই একীভূত শিক্ষার ধারণার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

একীভূত শিক্ষা শুধু একটি শিক্ষাপদ্ধতি নয়; এটি একটি মানবিক ও অধিকারকেন্দ্রিক দর্শন। ‘সবার জন্য বিদ্যালয়’ ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বাস করে যে বিদ্যালয় হবে এমন একটি স্থান, যেখানে সব শিশু শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ভাষাগত কিংবা সামাজিক ভিন্নতা সত্ত্বেও একসঙ্গে শেখার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ শিশুকে আলাদা করে নয়, বরং বৈচিত্র্যকে সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেই শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে।

ইউনেস্কোর মতে, একীভূত শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষার বিষয়বস্তু, কাঠামো, কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে সব শিশুর জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়।

এর মূল দর্শন হলো শিশুকে বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে জোর করে মানিয়ে নেওয়া নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থাকেই এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন ও বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারে। একীভূত শিক্ষা মূলত সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে সবাইকে একইভাবে দেখার চেয়ে প্রত্যেক শিশুর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব শিশুর সক্ষমতা, শেখার গতি ও প্রকাশভঙ্গি এক নয়।

কেউ হয়তো শ্রবণপ্রতিবন্ধী, কেউ অতি মেধাবী, আবার কেউ অন্যদের তুলনায় ধীরে শেখে। তাই সবার জন্য একই পদ্ধতি প্রয়োগ করাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা যায় না। একীভূত শিক্ষা বরং প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে শেখার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে।

বাংলাদেশের সংবিধানেও সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১৯৯০ সালের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে প্রবেশের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনেও মূলধারার শিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে এখনও বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে বিদ্যালয়ে ভর্তি হার বাড়লেও এখনও বহু শিশু শিক্ষার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। শুধু বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা এবং শেখার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী অবকাঠামো নেই। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব, বড় আকারের শ্রেণিকক্ষ, নমনীয় কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক অসচেতনতা একীভূত শিক্ষার বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলেছে।

বিশেষ করে আমাদের সমাজে এখনও অনেক মানুষ প্রতিবন্ধিতা বা ভিন্ন সক্ষমতাকে স্বাভাবিক বৈচিত্র্য হিসেবে নয়, বরং করুণার বিষয় হিসেবে দেখে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, উপহাস ও অবহেলার শিকার হয়। সম্ভবত এখানেই একীভূত শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। আমরা একে অনেক সময় সহানুভূতির বিষয় হিসেবে দেখি, অথচ এটি মূলত অধিকার ও সমঅংশগ্রহণের প্রশ্ন। একজন শিশুকে করুণা করে পাশে বসানো আর তাকে শ্রেণিকক্ষের সমান সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একীভূত শিক্ষা সব শিশুর জন্য একটি মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণা। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিখন পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রত্যেক শিশুর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সক্ষমতা ও বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে তার উপযোগী শেখার পরিবেশ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। এমনকি অতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সৃজনশীল ও চ্যালেঞ্জিং শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োজন।

একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রেণিকক্ষ শুধু শিক্ষাগত উন্নয়ন ঘটায় না, বরং গণতান্ত্রিক চেতনা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুরা যখন ছোটবেলা থেকেই বৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, তখন তারা অন্যকে ‘ভিন্ন’ হিসেবে নয়, সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। এর ফলে গড়ে ওঠে আরও মানবিক, সহনশীল ও বৈষম্যহীন সমাজের ভিত্তি।

বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজিতেও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ শিক্ষা থেকে কোনো শিশুকে বাদ রেখে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে, যখন তার শিক্ষাব্যবস্থা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে শেখে। একীভূত শিক্ষা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধার বিষয় নয়। এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান।

সানজিদা স্বর্ণা

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত