ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

উচ্চশিক্ষার গোলকধাঁধা এবং নৈতিকতাহীন এক অন্ধ প্রজন্ম

শিমলা পাল
উচ্চশিক্ষার গোলকধাঁধা এবং নৈতিকতাহীন এক অন্ধ প্রজন্ম

ইট-পাথরের এই ব্যস্ত শহরে আমাদের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলো যত ওপরে উঠছে, আমাদের ভেতরের মানবিকতা বোধহয় ততই নিচে নেমে যাচ্ছে। আমরা সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়ানোর জন্য রাতের পর রাত জাগিয়েছি, নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি এবং ‘বড় কর্মকর্তা’ বানিয়েছি। আমরা গর্ব করে বলি, আমাদের সন্তানরা আজ সফল! কিন্তু সার্টিফিকেটের স্তূপ আর কর্পোরেট সফলতার চাকচিক্য দিয়ে কি ভেতরের নৈতিক পঙ্গুত্বকে ঢেকে রাখা যায়? আজ আমাদের সমাজ এক অদ্ভুত দেউলিয়া দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উচ্চশিক্ষার হার বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, আর ঠিক সমান্তরালভাবেই কমছে মানুষের ভেতরের মানবিক মূল্যবোধ। নিজের ক্যারিয়ারের আকাশ ছুঁতে গিয়ে আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে পড়েছি যে, যে মা-বাবার হাত ধরে আমাদের এই পথচলা, তাদেরই আমরা ফেলে আসছি একাকীত্বের অতল গহ্বরে। উচ্চশিক্ষার এই গোলকধাঁধা আমাদের আলো দিচ্ছে নাকি এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

সম্প্রতি ঢাকা শহরের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার আড়াল থেকে এক বৃদ্ধা মায়ের নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনাটি আমাদের সমাজের সেই মেকি সভ্যতার চামড়াটা টেনে হিঁচড়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে মায়ের তিন সন্তানই উচ্চশিক্ষিত, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চ বেতনে কর্মরত, সেই মায়ের শেষ সময়টা কেটেছে চরম একাকীত্বে। সন্তানরা যখন এসি রুমে বসে নিজেদের সাফল্যের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, মা তখন দরজার দিকে চেয়ে শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলেছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা কোনো একক পরিবারের বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়; এটি আসলে আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থার এক জীবন্ত ক্যানভাস।

আজকের সমাজ সন্তানদের জিপিএ-৫ পাওয়া আর নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করাকে ‘সফলতা’র একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেছে। সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই বাবা-মায়ের প্রত্যাশা শুরু হয় কীভাবে তাকে প্রতিযোগিতার বাজারে প্রথম করানো যায়। আমরা সন্তানদের পাঠ্যবইয়ের সব কঠিন সমীকরণ মুখস্থ করাচ্ছি, কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভেতর ‘সহমর্মিতা’ আর ‘কৃতজ্ঞতাবোধ’ নামের অনুভূতির বীজ বুনে দিতে ভুলে যাচ্ছি। ফলস্বরূপ, উচ্চশিক্ষার কারখানাগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার ডিগ্রিধারী বের হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের বড় একটা অংশ শেষ পর্যন্ত ‘উচ্চশিক্ষিত রোবট’ বা ‘ক্যারিয়ারিস্ট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, সংবেদনশীল ‘মানুষ’ হিসেবে নয়।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপ নেওয়ার হার গত দুই দশকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ মানুষ কোনো না কোনোভাবে একাকীত্ব, মানসিক অবহেলা অথবা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। উচ্চশিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের পরিবারেই প্রবীণদের একা ফেলে রাখার বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়, এটি আসলে আমাদের সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয়ের এক লাল সংকেত।

এই চরম নৈতিক অবক্ষয় রোধে রাষ্ট্র কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে, যেখানে পিতা-মাতার যত্ন ও ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করাকে সন্তানের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। এই আইন অমান্য করলে লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। কিন্তু আজ বড় বেদনার সঙ্গে প্রশ্ন তুলতে হয় যে জন্মদাত্রী মায়ের রক্তের ঋণে সন্তানের এই পৃথিবীতে আসা, তার প্রতি দায়িত্ববোধ কি এখন রাষ্ট্রের আইন দিয়ে, জেল-জরিমানার ভয় দেখিয়ে আদায় করতে হবে? যেখানে সন্তানের হৃদয়ের গভীরে থাকা ‘অন্তরের আইন’ বা নৈতিকতাই মরে গেছে, সেখানে কাগজের আইনের ধারা দিয়ে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা কতটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব? আইনের চাবুক দিয়ে হয়তো বৃদ্ধাশ্রম ঠেকানো যাবে, কিন্তু মনের ভেতরের যে অবহেলা আর একাকীত্ব, তার প্রতিকার কোন আইনে হবে?

বাস্তবতা হলো, আধুনিকতার মেকি চাদরে ঢাকা আমাদের এই সমাজ দ্রুত ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। নিজের ক্যারিয়ার, নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স আর সামাজিক স্ট্যাটাস টিকিয়ে রাখার এক অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়েছে এই প্রজন্ম। আর এই ইঁদুর দৌড়ের প্রথম বলি হচ্ছেন আমাদের প্রবীণরা। যে হাত একসময় সন্তানকে আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, শেষ বয়সে এসে সেই হাতগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। আজকের যুগে বৃদ্ধাশ্রম কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়, এটি আসলে জীবন্ত মা-বাবাকে সমাজ থেকে আইনত ‘বিসর্জন’ দেওয়ার এক আধুনিক কসাইখানা। লাখ টাকা খরচ করে ঘরের ড্রয়িংরুম সাজানো এই উচ্চশিক্ষিত প্রজন্ম আজ নিজের জন্মদাতার জন্য ঘরে কয়েক স্কয়ার ফিট জায়গা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে। নিজের স্ট্যাটাস বাঁচাতে তারা মা-বাবাকে ছুড়ে দিয়ে আসে বৃদ্ধাশ্রমের এক চিলতে বারান্দায়। মনে রাখা দরকার, বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি কক্ষ কোনো ইট-পাথরের দেয়াল নয়, ওটি আসলে সন্তানের অকৃতজ্ঞতার একেকটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। এই সামাজিক পঙ্গুত্ব থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধুমাত্র অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি দিয়ে যে একটি সুস্থ সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়, তা আজ প্রমাণিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিটি স্তরে নৈতিকতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকেও সচেতন হতে হবে?। সন্তানকে শুধু সফল ক্যারিয়ার গড়ার মন্ত্র না দিয়ে, একজন আসল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, সময় কিন্তু এক জায়গায় স্থির থাকে না। চাকা ঘোরে। আজ যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা আর ব্যস্ততার অজুহাতে জন্মদাতা বাবা-মাকে অবহেলা করছেন, তাদের সন্তানরাও কিন্তু এই একই আচরণ দেখেই বড় হচ্ছে। প্রকৃতির বিচার বড় নির্মম। আজকের সফল সন্তানরা যেন ভুলে না যান যে, নৈতিকতাহীন এই উচ্চশিক্ষার গোলকধাঁধায় পড়ে তারা আজ যে অন্ধকার ভবিষ্যৎ তৈরি করছেন, একদিন হয়তো তাদের নিজেদেরও সেই একই নিঃসঙ্গতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে হবে। বহুতল ভবনের কৃত্রিম আলোর চেয়ে মায়ের কোলের আলো যে অনেক বেশি পবিত্র আর নিরাপদ, এই সত্যটা আমরা যত দ্রুত উপলব্ধি করব, সমাজের জন্য ততই মঙ্গল।

অফিসের বসের এক ডাকে যারা ফাইল নিয়ে ছুটে যায়, অথচ মায়ের শেষ মুহূর্তের ফোন কলটি ধরার সময় পায় না তাদের ব্যাংকে টাকার পাহাড় থাকতে পারে, কিন্তু মনুষ্যত্বের দিক থেকে তারা চরম ফতুর। এই অন্ধ ও বধির প্রজন্মকে আমরা মেধাবী বলছি কোন মুখে? টাকা, স্ট্যাটাস আর কর্পোরেট আভিজাত্যের এই মেকি চাদর একদিন ছিঁড়ে যাবে, কিন্তু জন্মদাত্রীর এই দীর্ঘশ্বাস আর রক্তের ঋণ সমাজকে কখনোই ক্ষমা করবে না।

শিমলা পাল

তরুণ লেখক ও কলামিস্ট, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত