ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নদী দখলে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণ

উৎসব রায়
নদী দখলে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রাণ

নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ, কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।

তাই নদীকে বাংলাদেশের প্রাণ বলা হয়। গ্রামবাংলার জীবন ও কৃষি দীর্ঘদিন ধরেই নদীকেন্দ্রিক। প্রচলিত প্রবাদ- ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’-এর মধ্যেই নদী ও কৃষির গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে। মাছের প্রধান উৎস নদী, আর ভাত আসে কৃষিজমি থেকে। যুগ যুগ ধরে নদী কৃষির অন্যতম প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করে আসছে। নদী থেকে বয়ে আসা পলি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, যা অধিক ফলন নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। দেশের বহু কৃষক এখনও সেচের জন্য নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে নদীর অবদান অপরিসীম। একই সঙ্গে নদীপথে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হওয়ায় কৃষকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নদীর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ বাংলাদেশের অসংখ্য নদী দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদী দখলের ফলে শুধু জলপথই সংকুচিত হচ্ছে না, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাণশক্তি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অবৈধ দখলদারদের মাধ্যমে নদীর তীর ও নদীভূমি দখল করা হচ্ছে। কোথাও গড়ে উঠছে বাজার, কারখানা ও বসতবাড়ি; আবার কোথাও নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক নদী ক্রমেই সরু হয়ে পড়ছে। একসময় বাংলাদেশে প্রায় ১,১৭৮টি নদী ছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে এসব নদীর একটি বড় অংশ নাব্যতা হারিয়েছে কিংবা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। নদী দখল ও দূষণ এ পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ।

নদীর সংকোচন ও দূষণের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। সেচব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিজমির উর্বরতা কমছে এবং কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে মৎস্যসম্পদ কমে যাচ্ছে। নৌ-যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দখল ও দূষণের কারণে রাজধানী ঢাকার আশপাশের বহু খাল ও জলপথ এরইমধ্যে হারিয়ে গেছে অথবা মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ভারসাম্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। নদী রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, কৃষি সমৃদ্ধ হবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং টিকে থাকবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। নদী রক্ষা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তাই দেশের প্রাণপ্রবাহকে বাঁচাতে আজই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। নদীকে রক্ষা করতে পারলেই রক্ষা পাবে বাংলাদেশ।

উৎসব রায়

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত