ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

স্বপ্নের পর্যটনকেন্দ্র অব্যবস্থাপনার চক্রে বন্দি

তানজিনা আক্তার চৈতি
স্বপ্নের পর্যটনকেন্দ্র অব্যবস্থাপনার চক্রে বন্দি

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত সুদীর্ঘ সময় ধরেই নগরবাসীর বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। চট্টগ্রাম শহরের কোলাহল থেকে সামান্য দূরে এই সৈকতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের কাছে হয়ে ওঠে ক্লান্তি, হতাশা দূর করা ও প্রশান্তির আশ্রয়স্থল । এখানে বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে শোনা যায় ঢেউয়ের মৃদু গর্জন, যা মনে এক অদ্ভুত আনন্দ এনে দেয়। বিকেলের দিকে সূর্য যখন ধীরে ধীরে অস্ত যায়, তখন আকাশে রঙ-বেরঙ্গের খেলা শুরু হয়- লাল, কমলা ও সোনালি আভা মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক মোহনীয় দৃশ্য।

এই সূর্যাস্তই পতেঙ্গার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত, যা প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীকে টেনে আনে। এছাড়াও সৈকতের আকাশ ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া বিমান বাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টারের দৃশ্য দর্শনার্থীদের মনে এক অনন্য রোমাঞ্চের সৃষ্টি করে। সূর্যাস্তের রঙিন আকাশ, সাগরের ঢেউ আর শীতল বাতাস- সব মিলিয়ে পতেঙ্গা যেন এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। পতেঙ্গার পর্যটন সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বিশাল। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, শহরের খুব কাছাকাছি অবস্থান এবং কর্ণফুলী টানেল এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই টানেলের কারণে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পথ সুগম করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের দ্রুত ও সহজ যাতায়াত নিশ্চিত হয়েছে। যা পতেঙ্গাকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। অব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘ কালো ছায়া আজও পতেঙ্গা নগরীকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা। যেমন- অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ দূষণ, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ঘাটতি, স্থানীয় অসাধু চক্র, স্থানীয় জনগণের সচেতনতার অভাব। সৈকতের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এসব দোকানে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য বিরূপ প্রভাব তৈরি করে।

পর্যটকরা সমুদ্র তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য, খাবারের প্যাকেট ইত্যাদি ফেলে প্রতিনিয়ত পরিবেশকে নোংরা করে। নির্ধারিত স্থানে ডাস্টবিনের অপর্যাপ্ততা, নিয়মিত পরিষ্কার ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া বেড়িবাঁধ দখল করে পরিচালিত ব্যবসা সৈকতের পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট করে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের উদ্যোগে এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে সৈকতকে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তবুও কিছু মৌলিক সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য নির্মিত বসার আসনগুলোর রং উঠে জরাজীর্ণ হয়ে গেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তা পুনসংস্কার করা হয়নি। যার ফলে সামগ্রিক সৌন্দর্য বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে । এছাড়াও সৈকত এলাকায় একটি অসাধু স্থানীয় চক্রের উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। যারা পর্যটকদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করে। অনেক ক্ষেত্রে জোরপূর্বক হকাররা তাদের পণ্য অধিক মূল্যে কিনতে বাধ্য করে।

এটি পর্যটকদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের জন্য জায়গাটিকে অনুপযোগী করে তুলে।

একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পটে এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সামাজিক দিক থেকেও এই অঞ্চলে কিছু উদ্বেগজনক বাস্তবতা রয়েছে। সৈকতসংলগ্ন এলাকায় অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবিকার তাগিদে ফুল, বাদাম, খেলনা ইত্যাদি বিক্রি করছে। এতে করে তারা শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশাসনের অন্তরালে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাঙ্গ। এই সব কিশোররা সন্ধ্যার পর সমুদ্রতীরে মাদক সেবন করে । এ নগরীতে গড়ে উঠেছে হোটেল ব্যবসার নামে পতিতাবৃত্তি। নারী পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতার সমূখীন হচ্ছে। স্থানীয় বখাটেদের দারা উত্ত্যক্ত হয়ে থাকে অনেক নারী পর্যটক। যা একটি পরিবারবান্ধব পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলার পথে বড় বাধা।

এই ধরনের আচরণ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ইতিবাচক দিক হলো- বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেন এর উদ্যোগে পার্কিং ফি কমানো হয়েছে, পার্কিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং ইজারাদারদের জন্য বিধিবদ্ধ নিয়ম প্রণয়নের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করছি। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত শুধুই স্থানীয় বিনোদন কেন্দ্র নয়। এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। পরিশেষে বলতে চাই, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা, কঠোর ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সচেতনতা। উন্নয়নের পাশাপাশি যদি শৃঙ্খলা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যায়, তবে পতেঙ্গা হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের গর্বিত এক আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য।

তানজিনা আক্তার চৈতি

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত