ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে হারাচ্ছে শৈশব

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে হারাচ্ছে শৈশব

একসময় শৈশব মানেই ছিল মাঠে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ, পুকুরে লাফ দেওয়া বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, গল্পের বই পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে প্রাণবন্ত সময় কাটানো। বিকাল হলেই পাড়া-মহল্লার মাঠগুলো শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত। কখনও ক্রিকেট, কখনও ফুটবল, কখনও লুকোচুরি। এসব খেলাই ছিল শৈশবের আনন্দের প্রধান উৎস। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে আজকের শিশুরা ক্রমেই বাস্তব জগতের পরিবর্তে ডিজিটাল স্ক্রিনের জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে।

মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ স্ক্রিন যেন শিশুদের নতুন খেলাঘর হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে কি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈশব? প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আধুনিক সভ্যতার এক অনন্য অর্জন। শিক্ষা, যোগাযোগ, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান। শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভার্চুয়াল লার্নিং ইত্যাদির মাধ্যমে তারা সহজে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও ক্রমশ আমাদের সামনে আসছে। শিশুরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে ব্যয় করছে। বর্তমানে অনেক পরিবারেই দেখা যায়, শিশুর কান্না থামাতে, খাবার খাওয়াতে কিংবা ব্যস্ত রাখতে তার হাতে একটি মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। শিশুরা বাস্তব খেলাধুলার পরিবর্তে ভিডিও দেখা, মোবাইল গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে তাদের শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে এবং প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গে স্বাভাবিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি কমে যায় শারীরিক ব্যায়াম ও খেলাধুলার সুযোগ। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য যে সক্রিয় জীবনযাপন প্রয়োজন, তা বাধাগ্রস্ত হয়।

মানসিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা ভাবায়। বাস্তব জীবনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং দলগত কাজের শিক্ষা সাধারণত খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে অর্জিত হয়। কিন্তু যখন শিশুদের অধিকাংশ সময় অনলাইন জগতে কাটে, তখন এসব সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যায়। অনেক শিশু একাকিত্বে ভোগে, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যায় পড়ে এবং বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও শিশু-কিশোরদের ওপর ক্রমশ বাড়ছে। অল্প বয়সেই তারা নানা ধরনের তথ্য ও কনটেন্টের সংস্পর্শে আসছে, যার সবই তাদের জন্য উপযোগী নয়। অনেক সময় অন্যের জীবনযাত্রা দেখে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে। সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং অনুপযুক্ত কনটেন্টের মতো ঝুঁকিও তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে প্রযুক্তি শিশুদের জন্য ক্ষতিকর এবং তা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন-টাইম নির্ধারণ করা, তাদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া। একই সঙ্গে পরিবারে একসঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। বিদ্যালয় এবং সমাজেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তির সুফল ও কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে নির্মল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ এবং শিক্ষা একজন মানুষের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, শিশুরা যেন বাস্তব জীবন, প্রকৃতি, খেলাধুলা এবং মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত না হয়।

ডিজিটাল স্ক্রিন হয়তো জ্ঞান ও বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু কখনোই শৈশবের বিকল্প হতে পারে না। আগামী প্রজন্মের সুস্থ ও সুন্দর বিকাশের স্বার্থে ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে হারিয়ে যেতে বসা শৈশবকে পুনরায় আবিষ্কার করে শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়া আজ আপনার, আমার এবং সবার দায়িত্ব।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত