প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জুন, ২০২৬
মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম হলো চিকিৎসাসেবা। আর এই চিকিৎসাসেবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নার্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীরা। একজন অসুস্থ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছেন; সেখানে চিকিৎসক আছেন, ফার্মাসিস্ট আছেন, নার্সও আছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। তাহলে কি সেই রোগী যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাবেন?
সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যেমন দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানসম্মত ও নিরাপদ ওষুধ। রোগীর সেবায় ব্যবহৃত প্রতিটি ওষুধ নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে প্রায়ই ভুয়া চিকিৎসক, জাল সনদধারী স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের খবর সামনে আসে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- চিকিৎসাসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন অনিয়ম কেন?
উন্নত বিশ্বে চিকিৎসাসেবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর একটি। সেখানে রোগীর নিরাপত্তা ও সেবার মানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই স্বাস্থ্যসেবার নানা অসংগতি সামনে আসে। কোথাও সনদবিহীন ব্যক্তি চিকিৎসা প্রদান করছেন, কোথাও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও জনবল কাঠামো অনুসরণ না করেই স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের যথাযথ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয় না। আবার কিছু অসাধু ব্যক্তি জাল সনদ ব্যবহার করে ফার্মেসি পরিচালনার অভিযোগেও অভিযুক্ত হন। ফলে চিকিৎসাসেবার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থই যেন অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে দেশে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই হরহামেশা অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অথচ একটি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা থেকে বাজারে আসার আগে তার গুণগত মান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। ওষুধের মান বজায় রাখতে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা নিরলসভাবে কাজ করেন। কিন্তু সেই মান রক্ষার বাস্তব প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে অনেক ওষুধের রাসায়নিক গুণাগুণ পরিবর্তিত হতে পারে, যা রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অথচ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ফার্মেসি দেখা যায়, যেখানে প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত না করেই ওষুধ সংরক্ষণ ও বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগও পাওয়া যায় যে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদোত্তীর্ণের কাছাকাছি ওষুধ যথাযথভাবে পৃথক সংরক্ষণ না করে বিক্রির জন্য রেখে দেন। এর অন্যতম কারণ সাধারণ মানুষের অসচেতনতা। অনেকেই ওষুধের নাম, ব্যাচ নম্বর কিংবা মেয়াদ যাচাই না করেই ওষুধ গ্রহণ করেন।
সম্প্রতি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে দোকানদার আমাকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে বলে একটি বাক্স থেকে একটি স্ট্রিপ ওষুধ দেন এবং নির্ধারিত মূল্য গ্রহণ করেন। ওষুধের মোড়ক খুলে দেখি সেটির মেয়াদ এরইমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি জানালে তিনি প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং পরে বাক্স পরীক্ষা করে অন্য একটি স্ট্রিপ দিয়ে দেন। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ স্ট্রিপটি আবার সংরক্ষণ করে রাখেন। প্রশ্ন হলো- কেন?
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অতীতেও বিভিন্ন ফার্মেসিতে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। ফলে ওষুধ কেনার সময় মেয়াদ যাচাই করা এখন আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটিও সবার জন্য জরুরি। শুধু একটি ফার্মেসি নয়, বিভিন্ন স্থানে ঘুরলেই এমন অনেক অনিয়ম চোখে পড়বে। কোথাও রেফ্রিজারেটরে ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কোথাও প্রয়োজনীয় সংরক্ষণবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে না। এসব বিষয় ওষুধের গুণগত মান ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এসব অনিয়ম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্যমান নজির তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটছে। অথচ ভেবে দেখুন, একটি মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট ওষুধ যদি আপনার সন্তান, মা-বাবা কিংবা প্রিয়জনের হাতে পৌঁছে যায়, তাহলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা নিরাপদ ও নির্ভেজাল রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি, কার্যকর নীতিমালা ও সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন। রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও কঠোর নিয়ম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সম্ভব।
সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে- ওষুধের মান অক্ষুণ্ণ রাখতে নির্দেশিত তাপমাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী শীতাতাপনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ও রেফ্রিজারেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং নিয়মিতভাবে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করতে হবে। প্রতিটি ফার্মেসিতে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহক যেন সহজেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্টকে শনাক্ত করতে পারেন, সে জন্য পরিচয়পত্র ও নিবন্ধন নম্বর দৃশ্যমান রাখা উচিত। মনে রাখতে হবে, ফার্মেসি কোনো সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওষুধ বিক্রয়ের সময় ম্যানুয়াল অথবা সফটওয়্যারভিত্তিক ই-রশিদ প্রদান বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। রশিদে ওষুধের নাম, ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে ক্রেতারা সহজেই তথ্য যাচাই করতে পারবেন। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোর নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত ও যোগ্য জনবল তদারকির কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।
কাব্য সাহা
রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট ও কলামিস্ট