প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ জুন, ২০২৬
মানুষের মনস্তত্ত্ব এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের আধার। মুখে আমরা মানবতার জয়গান গাইলেও অবচেতন মনে অন্যের সাফল্য সহজে মেনে নিতে পারি না। মানুষের মননে এক সুপ্ত পরশ্রীকাতরতা ও হীনম্মন্যতা কাজ করে। ফলে অন্যের মেধা ও সততার আলোয় নিজের খর্বকায় রূপটি ধরা পড়ার ভয়ে আমরা ভীত হয়ে পড়ি। এই ভীতি থেকে জন্ম নেওয়া তীব্র প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আমরা আলোকিত মানুষগুলোকে উপহাস করি, মেতে উঠি তাদের ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে। অন্যদিকে, অবচেতনভাবেই আমরা সেসব মন্দ ও নীতিহীন মানুষকে সমর্থন জোগাই, যারা আমাদের ভেতরের অন্ধকারকে বৈধতা দেয়। এর ফলে সমাজে অযোগ্য ও বিকৃত মানসিকতার মানুষরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, আর ভালো মানুষগুলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যায়। পৃথিবীতে ভালো কাজের শত্রু চিরকালই বিদ্যমান। প্রায়শই আমরা অন্যায়ের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে নিজেদের মনুষ্যত্ব, বিবেক ও মুক্তচিন্তাকে কবর দিই। নিজেরাই হয়ে উঠি এক-একজন বড় অন্যায়কারী, যা আমাদের সামগ্রিক পতনের পথ প্রশস্ত করে।
ক্ষমতার অন্ধত্ব ও মুক্তচিন্তার দ্বন্দ্ব মানবসভ্যতার এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি। সমাজ সব সময় সেই মানুষটিকে বেশি ভয় পায়, যিনি মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখান এবং প্রচলিত অন্ধবিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথাই ধরা যাক। তিনি কোনো বিদ্রোহ করেননি, হাতে তুলে নেননি কোনো অস্ত্র; কেবল তরুণদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছিলেন। প্রচলিত দেবতাদের প্রতি অবিশ্বাস ও তরুণ সমাজকে বিপথগামী করার মিথ্যা অভিযোগে তাকে ‘হেমলক’ বিষ পানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সমাজ চায়নি মানুষ অন্ধ অনুকরণ বাদ দিয়ে নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করুক। একই রকম ভয়ংকর পরিণতির শিকার হয়েছিলেন প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার প্রখ্যাত গণিতবিদ ও দার্শনিক হাইপেশিয়া। অগাধ জ্ঞান ও স্বাধীন চিন্তাধারার কারণে তৎকালীন গোঁড়া ধর্মীয় গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন তিনি। ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে একদল উগ্রপন্থি তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, চিন্তাশূন্য সমাজ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে।
বিজ্ঞান ও বস্তুনিষ্ঠ সত্যের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না; বরং তা ছিল জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো। সমাজ ও প্রতিষ্ঠান সব সময়ই নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদকে পরম সত্য বলে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। আর যারা এর বৈজ্ঞানিক অসারতা প্রমাণ করেছেন, তাদেরকেই পেতে হয়েছে নির্মম শাস্তি। গ্যালিলিও গ্যালিলেই যখন দূরবিনের সাহায্যে প্রমাণ করলেন পৃথিবী স্থির নয়, বরং তা সূর্যের চারদিকে ঘোরে; তখন তা চার্চের মতবাদবিরোধী হওয়ায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়, তার প্রকাশনাগুলো নিষিদ্ধ করা হয় এবং তিনি আমৃত্যু গৃহবন্দি হন। ইতালীয় দার্শনিক জর্দানো ব্রুনোর পরিণতি ছিল আরও ভয়াবহ। মহাবিশ্বের অসীমতা নিয়ে যুগান্তকারী তত্ত্ব দেওয়ায় ধর্মীয় আদালত তাকে ১৬০০ সালে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে হত্যা করে। এমনকি স্প্যানিশ চিকিৎসক মাইকেল সার্ভেটাস, যিনি প্রথম ফুসফুসীয় রক্ত সঞ্চালন সঠিকভাবে বর্ণনা করেন, তাকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। তার ধর্মতাত্ত্বিক মতাদর্শ চার্চের বিরুদ্ধে যাওয়ায় ১৫৫৩ সালে তাকেও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। সত্যের এই জ্বলন্ত চিতাগুলো বারবার প্রমাণ করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক অহংকার কখনোই সত্যের কাছে সহজে মাথা নত করে না।
মানুষের পেশাগত অহংকার ও রাজনৈতিক ভ্রান্তির কাছে বিজ্ঞান এবং মানবকল্যাণ কীভাবে পরাজিত হয়, তার করুণ উদাহরণগুলো সমাজের বিদ্বেষমূলক মানসিকতারই প্রতিফলন। হাঙ্গেরীয় চিকিৎসক ইগনাৎস জেমেলভেইস চিকিৎসাবিজ্ঞানে আবিষ্কার করেছিলেন- চিকিৎসকেরা প্রসবের আগে সাবান দিয়ে হাত ধুলে মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। কিন্তু তৎকালীন অহংকারী চিকিৎসকরা সাধারণ একজন সহকর্মীর এই যুগান্তকারী পরামর্শ গ্রহণ করাকে অপমানজনক মনে করে প্রত্যাখ্যান করেন। সহকর্মীদের ক্রমাগত উপহাস ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জেমেলভেইস মানসিক ভারসাম্য হারান এবং শেষ পর্যন্ত পাগলাগারদে রক্ষীদের নির্মম প্রহারে তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, রুশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী নিকোলাই ভ্যাভিলভ মানবজাতিকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষায় বিশ্বজুড়ে ফসলের বীজ সংগ্রহ করে বিশাল জিনব্যাংক তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তার প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য জোসেফ স্তালিন-সমর্থিত ভ্রান্ত বিজ্ঞানীদের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপক্ষে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যে মানুষটি সারা জীবন মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য কাজ করেছেন, জেলের ভেতর অনাহারে সেই মহান বিজ্ঞানীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে মানুষের জীবনরক্ষাকারী আলোকেও নিভিয়ে দিতে পারে।
সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা অকৃতজ্ঞ এবং নিষ্ঠুর হতে পারে, তার ভয়াবহ প্রমাণ লুকিয়ে আছে আধুনিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের মর্মান্তিক বিদায়ের মাঝে। ফরাসি বিপ্লবের সময় চরম রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হতে হয় আধুনিক রসায়নের জনক অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়েকে, যিনি দহন প্রক্রিয়ার নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। গিলোটিনে তার শিরশ্ছেদ করার সময় বিচারক দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কোনো বিজ্ঞানীর প্রয়োজন নেই।’ একইভাবে আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ত্রাতা অ্যালান টুরিংয়ের প্রতি সমাজের অবিচার মানব-ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই জনক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির অত্যন্ত জটিল ‘এনিগমা’ কোড ভেঙে লাখো প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনাচরণের কারণে ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাসায়নিক খোজাকরণের (ঈযবসরপধষ ঈধংঃৎধঃরড়হ) মতো চরম অমানবিক শাস্তি দেয়। রাষ্ট্রের এই অপমান ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ১৯৫৪ সালে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। সমাজ তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবাটুকু নিলেও, প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
বিবর্তনের এত হাজার বছর পেরিয়ে এসে আমরা কি সত্যিই আজও ‘মানুষ’ হতে পেরেছি? প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আর আধুনিকতার মোড়কে আমরা হয়তো উন্নত হয়েছি, কিন্তু আমাদের ভেতরের সেই আদিম পরশ্রীকাতরতা, হীনম্মন্যতা আর অন্যের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হওয়ার পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো আজও আমাদের আত্মাকে বন্দি করে রেখেছে। আমরা আজও আলোকিত মানুষকে টেনে নিচে নামাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি; অন্যায়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিই। এটিই প্রমাণ করে যে আমাদের মগজ আধুনিক হলেও হৃদয় আজও অন্ধকার রয়ে গেছে। সত্যিকারের মানুষ হওয়া মানে কেবল জীবতাত্ত্বিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নয়; বরং অন্যের আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে শেখা ও সততার পক্ষে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো। যেদিন আমরা অন্যের সাফল্যকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে না দেখে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করতে শিখব এবং অন্যায়ের বিপরীতে সাহসের সঙ্গে বিবেককে জাগ্রত করব, শুধু সেদিনই পশুর প্রবৃত্তি জয় করে সত্যিকার অর্থে আমরা ‘মানুষ’ হতে পারব। অন্যথায় আমরা পোশাকি সভ্যতায় ঢাকা একদল অমানবিক প্রাণীর ভিড়েই থেকে যাব।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ