প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ জুন, ২০২৬
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের আলোচনা সাধারণত পিতৃতন্ত্র, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা সামাজিক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব এবং তার সামাজিক অভিঘাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে নিয়ে কর্মসংস্থানহীন জীবন শুধু একজন তরুণের স্বপ্ন ভেঙে দেয় না; অনেক ক্ষেত্রে তা ধ্বংস করে দেয় সম্পর্ক, পরিবার এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিও। ফলে বেকারত্ব এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতা ও নারী নির্যাতনের অন্যতম অনুঘটক।
ঢাকার উত্তরায় বহুতল ভবনের ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরেও এখানে বাস করে হাজারো নিঃসঙ্গ মানুষ। তাওহিদুল ইসলাম কনক (ছদ্মনাম) তাদেরই একজন। ঝালকাঠির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন কৃতিত্বের সঙ্গে। স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি, সম্মানজনক জীবন এবং ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে একটি সুখী সংসার। কিন্তু চাকরির বাজার তাকে গ্রহণ করেনি। একের পর এক লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, অপেক্ষা এবং ব্যর্থতা সব মিলিয়ে জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সেই হতাশার আগুন একসময় ছড়িয়ে পড়ে পারিবারিক সম্পর্কে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং আত্মসম্মানের ক্ষয় শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়।
পিংকি (ছদ্মনাম) ছিলেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী। সাত বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল তার। দুজনেরই স্বপ্ন ছিল চাকরি, প্রতিষ্ঠা এবং সংসার। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। পিংকি চাকরি পেতে দেরি করলেন, আর সেই সুযোগে তার প্রেমিক অধিক যৌতুক ও সামাজিক সুবিধার আশায় অন্যত্র বিয়ে করে ফেললেন। পরে পিংকি নিজ যোগ্যতায় সরকারি চাকরি পেলেও হারিয়ে ফেলেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিশ্বাসটুকু। তার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা শুধু পুরুষকেই নয়, নারীকেও সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
মো. খলিলুর রহমান (ছদ্মনাম) ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের একজন তরুণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রেম করে বিয়ে করলেও সংসার টিকিয়ে রাখার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য ছিল না। ধীরে ধীরে দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব তৈরি হয়। বিচ্ছেদের পর তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। খলিলের গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি বাংলাদেশের হাজারো শিক্ষিত বেকারের প্রতিচ্ছবি।
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু বর্তমানে ডিগ্রি অর্জন অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন বেকার থেকে যাচ্ছে। এই বেকারত্ব শুধু আর্থিক সংকট নয়; এটি সৃষ্টি করছে হতাশা, বিষণ্ণতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
কার্ল মার্ক্স মনে করতেন অর্থনৈতিক ভিত্তিই সামাজিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুর্বল হলে পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। বেকারত্বের কারণে যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে অক্ষম মনে করতে শুরু করেন, তখন তার আত্মপরিচয় ও সামাজিক অবস্থান সংকটে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে ক্ষোভ, হতাশা এবং আগ্রাসী আচরণ বৃদ্ধি পায়।
ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি নগরায়ণ ও শিল্পায়নের সঙ্গে মানুষের মানসিক বিচ্ছিন্নতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছিলেন। বাংলাদেশের শহরগুলোতে আজ সেই বাস্তবতা দৃশ্যমান। লাখ লাখ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে শহরে অবস্থান করছে চাকরির আশায়। কিন্তু সুযোগের অভাব তাদের মধ্যে তৈরি করছে হতাশা, যা অনেক সময় পারিবারিক সহিংসতার রূপ নেয়।
নারী নির্যাতনের পেছনে অর্থনৈতিক কারণের গুরুত্ব প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষের বেকারত্ব ও আয়ের অনিশ্চয়তা পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপ অনেক সময় স্ত্রী বা সঙ্গীর ওপর সহিংস আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর শত শত নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, পারিবারিক দ্বন্দ্বের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের সঙ্গে পারিবারিক অস্থিরতার সম্পর্ক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি। অনেক শিক্ষার্থী এমন বিষয়ে পড়াশোনা করেন, যার সঙ্গে চাকরির বাজারের সরাসরি সংযোগ নেই। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পরও তারা কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, ইসলামিক স্টাডিজ, ফোকলোর, সংস্কৃত, চারুকলা কিংবা নাট্যতত্ত্ব এসব বিষয়ে শিক্ষার নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব বিষয়ে স্নাতকদের জন্য কর্মক্ষেত্র তুলনামূলক সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের পর দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও কর্মসংস্থানের বিস্তার সেই হারে ঘটেনি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তার তুলনায় অনেক কম। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশেও শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং বা সহায়তা ব্যবস্থা নেই। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন বারবার চাকরির পরীক্ষায় ব্যর্থ হন, তখন তিনি নিজেকে সমাজের কাছে অযোগ্য মনে করতে শুরু করেন। এই আত্মসম্মানহানি অনেক সময় তাকে আক্রমণাত্মক করে তোলে। পরিবার ও সম্পর্ক তখন হয়ে ওঠে তার হতাশার প্রকাশক্ষেত্র।
নারীর সাফল্য কেন অনেকের কাছে হুমকি? বাংলাদেশের সমাজে এখনও এমন মানসিকতা রয়েছে, যেখানে নারীর আর্থিক সাফল্যকে অনেক পুরুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। যখন নারী চাকরি পান কিন্তু পুরুষ বেকার থাকেন, তখন সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়। এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে সংঘাতের জন্ম দেয়। প্রেম ও বিবাহ শুধু আবেগের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সম্পর্কও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে বিচ্ছেদ, সহিংসতা এবং মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববিদ্যালয় কি ডিগ্রি কারখানায় পরিণত হচ্ছে? দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে সনদ প্রদানই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি পান না। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা জরুরি।
উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা শিক্ষা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। ইসলাম কর্ম, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক শান্তিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষের জন্য তাই আছে, যার জন্য সে চেষ্টা করে’ (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। জীবিকার জন্য পরিশ্রম করা ইসলামে ইবাদতের অংশ হলেও কোনো আর্থিক সংকট, বেকারত্ব বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কখনোই নারী নির্যাতনের বৈধ কারণ হতে পারে না। বরং কোরআন ও হাদিসে স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব থেকে সৃষ্ট হতাশা ও পারিবারিক সহিংসতা ইসলামের ন্যায়, মানবিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যেমন সম্ভাবনার শক্তি, তেমনি কর্মসংস্থানের অভাবে তারা সামাজিক অস্থিরতার কারণেও পরিণত হতে পারে। তাই উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব, পারিবারিক ভাঙন এবং নারী নির্যাতনের এই আন্তঃসম্পর্কিত সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বর্তমান জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী ও দেশনায়ক তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে দেশের তরুণ সমাজের প্রত্যাশা উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা সংস্কার, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির বিস্তার এবং তরুণদের জন্য সহজ শর্তে স্টার্টআপ ও স্বনিযুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক মূল্যবোধভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি। কারণ কর্মহীন তরুণের হতাশা যদি আশায় রূপান্তরিত করা যায়, তবে তা শুধু অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করবে না; কমিয়ে আনবে পারিবারিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন এবং সামাজিক অবক্ষয়ও। একটি দক্ষ, মানবিক ও কর্মসংস্থানমুখী বাংলাদেশ গঠনের মধ্য দিয়েই তরুণদের স্বপ্ন, নারীদের নিরাপত্তা এবং জাতির ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা হতে পারে এমন প্রত্যাশাই আজ দেশের কোটি মানুষের।
পরিশেষে, একজন তরুণ যখন ডিগ্রি হাতে নিয়ে কর্মহীন থাকেন, তখন শুধু একটি চাকরির সুযোগ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় জীবন। সেই হতাশা যখন পারিবারিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন কিংবা আত্মধ্বংসে রূপ নেয়, তখন তা গোটা সমাজের ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব আজ বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি মানবিক, সামাজিক এবং নৈতিক সংকটও বটে।
তাই সময় এসেছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নীতিকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনা করার। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষা শুধু সনদ নয়, জীবনের দক্ষতা দেবে; যেখানে কর্মসংস্থান হবে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সেতুবন্ধন এবং যেখানে ভালোবাসা, পরিবার ও মানবিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কাছে পরাজিত হবে না। কারণ একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন তার তরুণরা আশা নিয়ে বাঁচতে পারে, আর তার নারীরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করে।
জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট