ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রিলস সংস্কৃতি ও আমাদের জীবন

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
রিলস সংস্কৃতি ও আমাদের জীবন

আজ থেকে কিছু বছর আগেও মানুষের সকাল শুরু হতো খবরের কাগজ, বই পড়া, পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প করে অথবা পাড়া বা মহল্লায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই চিত্র এখন অপ্রতুল। এখন অবসরের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে হাতে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিন। বিশেষ করে ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ৩০ বা ৫০ সেকেন্ডের ভিডিও বা ‘রিলস’ আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জীবনের একটি পরিচিত মাধ্যম হওয়ায়, এটি একটি সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের এই ভিডিওগুলো যেমন বিনোদন ও নতুন তথ্যের দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা সামাজিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক সংকট।

ফলে রিলস সংস্কৃতি এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি আমাদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর সূক্ষ্মণ্ডগভীর প্রভাব বিস্তারকারী একটি মাধ্যম। শিশু হতে শুরু করে বৃদ্ধ, সবাই রিলস সংস্কৃতির স্বীকার। রিলসের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর দ্রুততা ও সহজলভ্যতা। অল্প সময়ে বিনোদন, তথ্য কিংবা নতুন কিছু জানার সুযোগ মানুষকে আকৃষ্ট করে। একজন ব্যবহারকারী কয়েক মিনিটেই শতাধিক ভিডিও দেখতে পারেন। ফলে বই পড়া বা বিশদ আলোচনায় মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে মানুষ সংক্ষিপ্ত ও তাৎক্ষণিক বিষয়বস্তুর প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে কনটেন্ট দেখার অভ্যাস মানুষের গভীর মনোযোগ ও বিশ্লেষণী চিন্তার সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

রিলস সংস্কৃতির প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের পরিচয়, সাফল্য কিংবা জনপ্রিয়তার মানদণ্ড নির্ধারণ করছেন লাইক, শেয়ার ও ভিউয়ের সংখ্যার মাধ্যমে। সামাজিক স্বীকৃতির এই ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা অনেককে মানসিক চাপ, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের মারাত্মক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। যখন কেউ দেখে অন্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, ভ্রমণ করছে বা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, তখন নিজের জীবনকে তুলনামূলকভাবে ব্যর্থ মনে হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সত্য হলো, রিলসে দেখা জীবন অনেক সময়ই আংশিক, সাজানো কিংবা পূর্ব-সম্পাদিত থাকে। শিক্ষাক্ষেত্রেও রিলস সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষণীয়। দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করার পরিবর্তে অনেক শিক্ষার্থী দ্রুত তথ্য গ্রহণের অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

ফলে বই পড়া, গবেষণাধর্মী লেখা অধ্যয়ন কিংবা গভীরভাবে কোনো বিষয় বোঝার আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাবে। যদিও শিক্ষামূলক রিলস অনেক ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা রাখে, তবে শিক্ষা কখনোই শুধু কয়েক সেকেন্ডের স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক অধ্যয়ন। তবে রিলস সংস্কৃতির সব দিক যে নেতিবাচক, এমনটা নয়। সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এটি শিক্ষা, সচেতনতা ও সৃজনশীলতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা কিংবা উদ্যোক্তা কার্যক্রমের প্রচারে রিলস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেক তরুণ নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন, যা আগে মোটেই সহজলভ্য ছিল না। ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তারাও স্বল্প ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। রিলস সংস্কৃতির প্রভাব পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও পড়ছে। একই ঘরে বসে থেকেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকেন। ফলে পারস্পরিক বোঝাপড়া, আবেগের আদান-প্রদান এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিকে অস্বীকার অসম্ভব। বরং প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারবোধ গড়ে তুলতে হবে। রিলস দেখার সময় নির্ধারণ, শিক্ষামূলক ও ইতিবাচক কনটেন্টকে উৎসাহ দেওয়া এবং বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও কর্মকাণ্ডে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতাদেরও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে। রিলস সংস্কৃতি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। মূল বিষয় হলো, আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব, নাকি প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমে রিলস হতে পারে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম; অন্যথায় এটি আমাদের মনোযোগ ও সামাজিক সম্পর্কের জন্য নীরব সংকটে পরিণত হতে পারে।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত