ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফসলে লাগামহীন কীটনাশক ও আমাদের স্বাস্থ্য সংকট

ওসমান গনি
ফসলে লাগামহীন কীটনাশক ও আমাদের স্বাস্থ্য সংকট

আমাদের প্রতিদিনের আহার্যের অপরিহার্য অংশ যে ফসলের মাঠ থেকে আসে, সেই মাঠগুলো আজ এক নীরব ও অদৃশ্য বিষের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। কৃষিনির্ভর এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার মুখে অন্ন তুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিবিড় চাষাবাদ এবং ফসলের ক্ষতিকারক পোকা দমনের নামে এক অভূতপূর্ব রাসায়নিক বিপ্লব ঘটে গেছে গত কয়েক দশকে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ আজ আমাদের অসচেতনতা, অতিমুনাফার লোভ এবং সঠিক নির্দেশনার অভাবে এক চরম অভিশাপে পরিণত হতে চলেছে। ফসলে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ আজ আর শুধু পরিবেশবাদী বা বিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি এখন প্রতিটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কড়া নাড়া এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট।

কৃষিজমিতে পোকা বা রোগবালাই দূর করতে কীটনাশক আবিষ্কার হয়েছিল ফসলের সুরক্ষার জন্য। একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় এবং নিয়ম মেনে এটি ব্যবহারের বিধান রয়েছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্রি-হারভেস্ট ইন্টারভাল’ বা কীটনাশক দেওয়ার পর ফসল তোলার মধ্যবর্তী নিরাপদ সময়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকেরা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ছাড়াই শুধু ডিলারের কথায় কিংবা প্রতিবেশীর দেখাদেখি জমিতে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহার করছেন। অনেক সময় দেখা যায়, সকালে সবজি বা ফলে বিষ স্প্রে করা হচ্ছে এবং বিকেলেই তা বাজারে বিক্রির জন্য তুলে আনা হচ্ছে। এই যে ফসলে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থেকে যাচ্ছে, তা ধুয়ে বা রান্না করে কোনোভাবেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব হয় না। ফলে প্রতিদিনের খাবারের থালার মাধ্যমে এই বিষ প্রবেশ করছে মানবদেহে। একে বলা হয় ‘ক্রনিক টক্সিসিটি’ বা দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া, যার ফল প্রকাশ পায় ধীরে ধীরে কিন্তু অত্যন্ত মারাত্মকভাবে।

জনস্বাস্থ্যের ওপর এই বিষাক্ত অভ্যাসের প্রভাব বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী। চিকিৎসকদের মতে, অতীতে যেসব রোগ শুধু বার্ধক্যের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হতো, আজ তা তরুণ এমনকি শিশুদের মধ্যেও মহামারি আকারে দেখা দিচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের খাদ্যে মিশে থাকা এই ধীরগতির বিষ। অতিরিক্ত কীটনাশকযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে মানুষের পরিপাকতন্ত্র সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাকস্থলীর দেয়াল দুর্বল হওয়া থেকে শুরু করে আলসার এবং পরবর্তীতে তা মারাত্মক ক্যান্সারে রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে লিভার ও কিডনির ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি। মানবদেহের রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান ছেঁকে বের করার মূল দায়িত্ব এই দুটি অঙ্গের। কিন্তু যখন প্রতিদিনের খাদ্যের সঙ্গে বিষের জোগান অব্যাহত থাকে, তখন একসময় এই অঙ্গগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ, দেশে কিডনি বিকল হওয়া এবং লিভার সিরোসিসের রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বয়ে আনছে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই রাসায়নিক বিষের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে আমাদের অনাগত প্রজন্ম এবং কোমলমতি শিশুরা। গর্ভবতী মায়েরা যখন বিষাক্ত উপাদানযুক্ত শাকসবজি বা ফলমূল আহার করেন, তখন সেই বিষ প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে জন্মগত ত্রুটি, অকাল গর্ভপাত এবং কম ওজনের শিশু জন্মের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের তুলনায় অনেক কম এবং তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো তখনও বর্ধনশীল থাকে। এই বয়সে কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে তাদের স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, সেখানকার শিশুদের বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে, মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং তাদের আচরণগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমরা অজান্তেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি পঙ্গু ও অসুস্থ জাতিতে পরিণত করছি।

শুধু স্নায়বিক বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতিই নয়, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক মানুষের হরমোন ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। অনেক কীটনাশকে এমন কিছু রাসায়নিক থাকে যা মানবদেহের হরমোনের অনুকরণ করে বা হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। একে বলা হয় ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর’। এর ফলে অল্প বয়সেই ছেলেমেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের অস্বাভাবিকতা, স্থূলতা এবং বড় হয়ে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের মতো গুরুতর সংকট তৈরি হচ্ছে। বন্ধ্যাত্বের যে সমস্যাটি বর্তমান সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে, তার পেছনেও এই খাদ্যের বিষাক্ততার বড় ভূমিকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া, মানুষের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি প্রতিনিয়ত এই বিষের কারণে ভেঙে পড়ছে, যার ফলে সাধারণ কোনো সংক্রমণও এখন অনেক সময় রূপ নিচ্ছে মারাত্মক ব্যাধিতে।

এই সংকটের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো স্বয়ং কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। মাঠপর্যায়ে কীটনাশক স্প্রে করার সময় আমাদের দেশের কৃষকরা সাধারণত কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা যেমন- মাস্ক, চশমা বা গ্লাভস ব্যবহার করেন না। তীব্র রোদের মধ্যে খালি গায়ে বা সাধারণ পোশাকে যখন এই বিষ বাতাসে ছিটানো হয়, তখন তা শ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুসে এবং ত্বকের লোমকূপ দিয়ে রক্তে প্রবেশ করে। এর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া বা ত্বকের অ্যালার্জি দেখা দেয়। আর দীর্ঘমেয়াদে এই কৃষকরা আক্রান্ত হচ্ছেন ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং পারকিনসন্স বা অ্যালঝেইমারের মতো মারাত্মক স্নায়বিক রোগে। অথচ দেশের অন্নসংস্থানকারী এই বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ অসচেতনতার কারণে নিজেদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছেন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সর্বগ্রাসী সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? পথ অবশ্যই আছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা। সবার আগে প্রয়োজন কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা। কোন ফসলে, কোন পোকার জন্য, কী পরিমাণ কীটনাশক দিতে হবে এবং স্প্রে করার কতদিন পর ফসল তোলা যাবে- এই সাধারণ জ্ঞানটুকু প্রতিটি কৃষকের কাছে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেবল সরকারি কৃষি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। জৈব বালাইনাশক এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে হবে, যেখানে ক্ষতিকর পোকা দমনে রাসায়নিকের পরিবর্তে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম বা বন্ধু পোকা ব্যবহার করা হয়।

একই সাথে বাজার মনিটরিং বা তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। উন্নত বিশ্বে ফসলের রেসিডিউ বা বিষের মাত্রা পরীক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং কঠোর আইন রয়েছে। আমাদের দেশেও প্রতিটি বড় পাইকারি বাজারে বা আড়তে ফল ও সবজির বিষাক্ততা পরীক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরি স্থাপন করা সময়ের দাবি। আইন অমান্য করে বিষ ছিটানোর সাথে সাথেই ফসল বাজারে আনা বিক্রেতা বা চাষিকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা না পেলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন আসলে অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ একটি অসুস্থ ও রুগ্ণ জাতি কখনোই দেশের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে না।

পরিশেষে বলা যায়, ফসলে কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার আজ আমাদের জনস্বাস্থ্যের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছে। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা শ্রেণির সমস্যা নয়, এটি এক জাতীয় বিপর্যয়। আমরা যদি এখনই এই বিষাক্ত চক্র থেকে বের হতে না পারি, তবে আগামী দিনে আমাদের হাসপাতালগুলো শুধু দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষে পূর্ণ হয়ে উঠবে এবং চিকিৎসার পেছনেই চলে যাবে, দেশের অর্জিত সিংহভাগ সম্পদ। খাদ্যকে আর বিষ হতে দেওয়া যায় না। জীবন বাঁচাতে এবং একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তুলতে কৃষিতে রাসায়নিকের এই লাগামহীন ব্যবহার রুখতেই হবে। কৃষির আধুনিকায়ন যেন মানুষের জীবনের মূল্যে না হয়, সেই বোধ জাগ্রত করার এখনই শেষ সময়।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত