প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জুন, ২০২৬
মাদক আজ আমাদের সমাজে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এর ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তরুণ সমাজের ওপর। যে তরুণরা একদিন দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও নেতৃত্বের প্রধান শক্তি হওয়ার কথা, তাদের অনেকেই আজ মাদকের করাল গ্রাসে আটকে পড়ছে। ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র।
মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজ ও শিশু-কিশোরদের মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে শুধু যুবকরাই নয়, শিশু-কিশোররাও মাদকের হুমকির মুখে রয়েছে। এতে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক ও মানবিক বিকাশ। ফলে সমাজ হারাচ্ছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় নাগরিকদের। মাদকের সহজলভ্যতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, হাতের নাগালে মাদক পাওয়া, তুলনামূলক কম মূল্য, বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রাপ্যতা এবং অনলাইনভিত্তিক লেনদেন। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি অনেক সময় মাদক চোরাচালানের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বর্তমানে পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও মাদক বিক্রেতাদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। সিগারেট, গাঁজা থেকে শুরু করে ফেনসিডিল ও বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক সহজেই পাওয়া যায়। কম দামের কারণে শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের একটি অংশ খুব সহজেই এসবের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মানুষের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি এর অপব্যবহারও বেড়েছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোপনে মাদক কেনাবেচা ও সরবরাহের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে মাদকের বিস্তার আরও দ্রুত ঘটছে।
মাদকের প্রসারে অসাধু ব্যবসায়ীদের ভূমিকাও কম নয়। অধিক মুনাফার আশায় তারা বিভিন্ন কৌশলে নতুন নতুন গ্রাহক তৈরি করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্র ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকাকে তারা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়। এর ফলে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ খুব সহজেই মাদকের সংস্পর্শে চলে আসে।
বন্ধুবান্ধবের প্রভাবও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। অনেক তরুণ কৌতূহলবশত বা বন্ধুদের উৎসাহে প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং একসময় আসক্তিতে আক্রান্ত হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু নেতিবাচক সাংস্কৃতিক প্রভাব মাদককে আধুনিকতা বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তরুণদের বিভ্রান্ত করছে। মাদকের প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ- সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্মক্ষমতা হারায় এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। এর ফলে পারিবারিক অশান্তি, নৈতিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে মানুষ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রথমেই মাদক উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদ ও পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে এবং তাদের চলাফেরা ও বন্ধুমহল সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমকেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
তবে মাদকাসক্তদের প্রতি শুধু শাস্তিমূলক নয়, মানবিক ও পুনর্বাসনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিও গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সমাজে অনেক সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং তারা আরও একাকী ও হতাশ হয়ে পড়ে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিরও প্রয়োজন সহানুভূতি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ। তাই আমাদের উচিত তাদের দূরে ঠেলে না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো, মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করা।
পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক মানুষই নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে। পরিশেষে বলা যায়, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সবার সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।
তাজকিয়া সুলতানা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়