প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জুন, ২০২৬
বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘সিজিপিএ’। একজন শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা, এমনকি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও যেন এখন একটি সংখ্যার মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়।
ফলে শিক্ষা ধীরে ধীরে জ্ঞান অর্জন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে বাস্তব দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিকাশের সুযোগ।
আজকাল অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবন আবর্তিত হয় ক্লাস, কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, মিডটার্ম ও ফাইনাল পরীক্ষাকে ঘিরে। ভালো সিজিপিএ ধরে রাখার চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক শিক্ষার্থী নতুন কিছু শেখার আগ্রহ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছে। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন, চিন্তার পরিধি বিস্তৃত করা এবং নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। বাস্তবতা হলো, এখন অনেকেই কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করে।
ফলে তারা ভালো ফলাফল অর্জন করলেও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় বহু দক্ষতা থেকে পিছিয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার সময় নয়; এটি একজন মানুষের নিজেকে আবিষ্কার করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কেউ সংগঠনের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে, কেউ সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা বিকাশ করে, আবার কেউ স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
কিন্তু বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী এসব কার্যক্রম থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে শুধুমাত্র এই আশঙ্কায় যে এতে তাদের সিজিপিএ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমাদের সমাজও এই মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। একজন শিক্ষার্থীর পরিচয় অনেক ক্ষেত্রেই তার ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভালো ফলাফল করলে প্রশংসা, আর সামান্য খারাপ ফল করলেই হতাশা, সমালোচনা ও তুলনার মুখোমুখি হতে হয়।
এই চাপ ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।
অনেকেই নিজের আগ্রহ, সৃজনশীলতা কিংবা মানসিক সুস্থতার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে একটি সংখ্যাকে।
অথচ বাস্তব জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্মক্ষেত্রে শুধু ভালো সিজিপিএ নয়, প্রয়োজন যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে কাজ করার মানসিকতা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ফলাফল দেখে নয়, বরং একজন প্রার্থীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। কারণ একটি ভালো সিজিপিএ একজন শিক্ষার্থীর পরিশ্রম ও একাডেমিক সাফল্যের প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু সেটি কখনোই তার সামগ্রিক যোগ্যতার পূর্ণ পরিচয় বহন করে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সিজিপিএ গুরুত্বহীন। অবশ্যই ভালো ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক অধ্যবসায় ও দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন।
কিন্তু জীবনের সফলতা শুধুমাত্র একটি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ এবং বাস্তব জীবনে নিজেকে উপস্থাপন করার সক্ষমতার মাধ্যমে।
তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে শুধু নম্বর নয়, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তারও যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু ভালো সিজিপিএ অর্জনের জন্য নয়; বরং নিজেকে একজন দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
কারণ দিনশেষে একটি ভালো সিজিপিএ হয়তো সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই পথে দীর্ঘসময় টিকে থাকতে প্রয়োজন বাস্তব দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, অভিযোজন ক্ষমতা এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে গড়ে তোলার মানসিকতা। সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি কেবল ফলাফলের খাতায় নয়, বরং একজন মানুষ কতটা দক্ষ, মানবিক ও সক্ষম হয়ে উঠতে পেরেছে তার মধ্যেই নিহিত।
নাহিসা আক্তার ফাতেমা
শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ