ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

নুসরাত সুলতানা
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা। ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতিতেও। ফিফা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওপেন ইকোনমিকস এবারের বিশ্বকাপের আসর নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ৮ হাজার ১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে হবে ৩ হাজার ৫০ কোটি ডলার, আর বিশ্বের অন্যান্য দেশে হবে ৪ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার। আর সব খরচ বাদ দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে ৪ হাজার ৯০ কোটি ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই বাড়াবে না, মানুষের আয়ও বাড়াবে। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের মোট ২ হাজার ৮০ কোটি ডলার আয় হতে পারে। আয়োজক কিংবা অংশগ্রহণকারী কোন দেশই নয় বাংলাদেশ তবুও বিশ্বকাপের প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। দেশের অর্থনীতিতে ফুটবল বিশ্বকাপের অবদান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে স্পেন আর কেপ ভার্দে ম্যাচের পর থেকে। বিশ্বমঞ্চে চমক দেখানো কেপ ভার্দের জাতীয় দলের জার্সির কাপড় সরবরাহ করেছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইয়ঙ্গান কর্পোরেশন। আর জার্সিগুলোর উৎপাদন হয়েছে ঢাকায় অবস্থিত স্পোর্টসওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কাপেলি স্পোর্টের কারখানায়।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরে বাংলাদেশের উপস্থিতি সাধারণত মাঠে দেখা যায় না। তবে পোশাক ও ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। কেপ ভার্দের এই আলোচিত ম্যাচ সেই অবদানকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সাথে আমাদের জানান দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে কীভাবে আরও ভালো অবস্থা তৈরি করা যায়। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও বিশ্বকাপের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনেক অস্থায়ীভাবে জার্সি আর পতাকা বিক্রয় করছেন। বিক্রয় বাড়ছে টেলিভিশনেরও, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আর্কষণীয় ছাড়ে বিভিন্ন টিভি কোম্পানিগুলো টিভি বিক্রয় করছে। খেলা দেখার জন্য বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও। এছাড়াও বিভিন্ন করপোরেট ব্র্যান্ড, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, কোমল পানীয় এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো (MFS) বিশ্বকাপের সময় সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করে। ম্যাচ চলাকালীন ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, স্ন্যাকস ও প্যাকেটজাত খাবারের বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোর জন্য এটি বিরাট আয়ের সুযোগ। কিন্তু অর্থনীতির এই অগ্রগতির মাঝেও আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। যে জার্সি কিংবা পতাকার ব্যবসা বিশ্বকাপ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার কাঁচামাল বেশিরভাগ রপ্তানি করতে হয় বিদেশ থেকে। বিশ্বকাপের সময় বাজিকর বা বেটিং সাইটগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের একাংশ খেলাকে কেন্দ্র করে জুয়াতে আসক্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি দেখা যায়। গভীর রাত পর্যন্ত খেলা দেখার কারণে পরের দিন কর্মক্ষেত্রে বা অফিসে কর্মীদের কার্যক্ষমতা (Productivity) হ্রাস পায়, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া অবৈধভাবে খেলা দেখার ফি বা বেটিংয়ের অর্থ পরিশোধে ক্রেডিট কার্ড বা কারেন্সি নিয়ন্ত্রণের নিয়ম লঙ্ঘিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এসব সীমাবদ্ধতাকে এড়িয়ে বিশ্বকাপে কীভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় করা যায় আমাদের সে দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

বরাবরই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অন্যান্য শিল্প থেকে এগিয়ে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পোশাক শিল্পের গুণগত মান উন্নয়নে আরও মনোনিবেশ দিতে হবে। কেপ ভার্দের মত বিশ্বের আরও দেশ যাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকে বিশ্বমঞ্চে নিজের চমক দেখাতে পারে পোশাক শিল্পকে সে দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে সেগুলোর উদ্যোক্তাদের ব্যবসা প্রসার করতে আরও অনুপ্রেরণা দেওয়া। জুয়া খেলা রোধে আইন প্রণয়নও শাস্তির বিধান করা।

সর্বোপরি বলা যায়, বিশ্বকাপের মত বৈশ্বিক আসর আমাদের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে সাময়িক বিনোদন ও আবেগের খোরাক বেশি জোগায়। তবে সঠিকভাবে নজরদারি ও কার্যকর নীতি গ্রহণ করার মাধ্যমে এই উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আরও লাভজনক করা সম্ভব হবে।

নুসরাত সুলতানা

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত