প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ জুন, ২০২৬
বঙ্গোপসাগর শুধু বিশাল জলরাশি নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য এক অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম। বিশাল এই সমুদ্রসীমা জয় করার পর বাংলাদেশের সামনে খুলে গেছে ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির এক নতুন দুয়ার।
সমুদ্রসীমা জয় ও ব্লু-ইকোনমির ধারণা : মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিশাল এলাকা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমান। ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি হলো সমুদ্রের সম্পদকে কেন্দ্র করে টেকসই উন্নয়নের ধারণা, যেখানে সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে আগামীর অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ইলিশসহ বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন মাছগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখতে পারে। বর্তমান মৎস্য আহরণ মূলত অগভীর সমুদ্রে সীমাবদ্ধ। আধুনিক ট্রলার এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে টুনা ও অন্যান্য মূল্যবান মাছ আহরণ করতে পারলে বাংলাদেশ বছরে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। এছাড়া সমুদ্রের শৈবাল বা সি-উইড চাষ একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। এই শৈবাল ওষুধ, প্রসাধনী ও খাদ্য শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সমুদ্রের তলদেশে থাকা গ্যাস ও খনিজ সম্পদ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল মজুদ রয়েছে। বিশেষ করে অগভীর ও গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে সফল অনুসন্ধান চালানো গেলে বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। এছাড়াও সমুদ্র সৈকতের বালুতে থাকা ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইটের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণ করে শিল্পায়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে পর্যটন শিল্পের এক বিশাল সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও সেন্টমার্টিনের পাশাপাশি নিঝুম দ্বীপ ও মানপুরা দ্বীপকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ক্রুজ শিপ বা প্রমোদতরীর মাধ্যমে সমুদ্র ভ্রমণের ব্যবস্থা করলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা যাবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। পায়রা ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হবে।
বিশাল এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে। যেমন- গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক জাহাজ ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সমুদ্র সীমায় জলদস্যুতা রোধ এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। আবার প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্প বর্জ্য সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান নষ্ট করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নীল অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং সুসমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা। মেরিন একাডেমি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্লু-ইকোনমি সংশ্লিষ্ট গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমুদ্রকেন্দ্রিক ব্যবসায় উৎসাহিত করতে হবে। আধুনিক সমুদ্র জরিপ বা হাইডোগ্রাফিক সার্ভে নিয়মিত সম্পন্ন করে সম্পদের সঠিক মানচিত্র তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি অনেকাংশেই বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করছে। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি সমুদ্র সম্পদ যদি আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস হয়, তবে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ত্বরান্বিত হবে।
সমুদ্র আমাদের সম্পদ নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের অংশ। তাই যথাযথ পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে নীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের আগামীর লক্ষ্য।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়