ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নারী কোথায় নিরাপদ! প্রশ্নের মুখে একটি সমাজ

ফাহিমা আক্তার
নারী কোথায় নিরাপদ! প্রশ্নের মুখে একটি সমাজ

একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, কতটা মানবিক কিংবা কতটা উন্নত- তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সেই সমাজে নারীরা কতটা নিরাপদ। উন্নয়নের নানা সূচকে আমরা এগিয়ে যাওয়ার গল্প বললেও বাস্তব জীবনে নারীর নিরাপত্তা আজও গভীর সংকটের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গণপরিবহন- সব জায়গায়ই নারীর উপস্থিতি যেন এক ধরনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রশ্নটি তাই খুব সরল, কিন্তু ভয়াবহভাবে জরুরি- নারী আসলে কোথায় নিরাপদ?

আমাদের সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য শুরু হয় অনেক আগেই, জন্মের আগেই বলা যায়। এখনও বহু পরিবারে পুত্রসন্তানের আগমনে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে সেই আবেগ অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। এই মানসিক কাঠামো একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর হয়। একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকেই শিখে যায়- তার স্বাধীনতা সীমিত, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত, এবং তার স্বপ্নের ওপর রয়েছে নানা ‘না’র দেওয়াল। ছেলেশিশুর জন্য যে সুযোগ, উৎসাহ ও স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবে আসে, মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে তা প্রায়শই শর্তসাপেক্ষ।

এই বৈষম্য শুধু পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করে। ফলে নারীর প্রতি নিয়ন্ত্রণ ও সন্দেহকে অনেকেই স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেন। এই স্বাভাবিকীকরণই পরবর্তীতে বড় ধরনের সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, নারীরা অনেক সময় বাইরের পৃথিবীর চেয়ে নিজের ঘরের ভেতরেই বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েন। স্বামী, বাবা বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের দ্বারাও অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ আসা অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশই পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত, যার মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগের হার উল্লেখযোগ্য। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়- এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরের নীরব ভাঙনের প্রতিচ্ছবি। যে ঘর একজন নারীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে সেটিই তার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গায় পরিণত হয়। সমাজ তখন এই বাস্তবতাকে দেখলেও অনেক সময় তা নিয়ে নীরব থাকে, কিংবা এটিকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যায়।

নারীর প্রতি সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনার পর অপরাধীর বিচার নিয়ে আলোচনা যতটা হয়, তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন ওঠে ভুক্তভোগীর পোশাক, আচরণ বা জীবনযাপন নিয়ে। যেন অপরাধের দায় অপরাধীর নয়, বরং নারীর ওপরই বর্তায়। এই মানসিকতা শুধু অন্যায়কে বৈধতা দেয় না, বরং নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকেও জটিল করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক ঘটনায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সামাজিক চাপ বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। ফলে একটি বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়- অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। এই ধারণাই সহিংসতার পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে।

তবে এই সংকট শুধু আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন গভীর সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তন। পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে সমতা শেখানো। ছেলে ও মেয়েকে সমান সুযোগ, সমান সম্মান এবং সমান স্বাধীনতার চর্চায় বড় করতে হবে। শিশুর মনে ‘নারী দুর্বল’ এই ধারণা নয়, বরং ‘নারী সমান’ এই বোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও লিঙ্গসমতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সম্মানবোধের শিক্ষা আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন এবং জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা প্রভাব বিবেচনা না করে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে কোনো আইনই পুরোপুরি কার্যকর হবে না। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের সভ্য হয়ে ওঠে, যখন তার নারীরা ভয়ের মধ্যে নয়, বরং মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে চলতে পারে। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো নারী সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাঁটতে ভয় পাবে না; যেখানে কর্মক্ষেত্র নিরাপদ হবে; যেখানে কন্যাসন্তানের জন্ম আনন্দের, বোঝা নয়। উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার শুধু নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনের প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হবে। প্রশ্নটি তাই শুধু নারীর নয়- এটি পুরো সমাজের আত্মজিজ্ঞাসা।

ফাহিমা আক্তার

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত