ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বধির যবনিকা ও পরম আলোর অনন্ত তৃষ্ণা

মমতাজ উদ্দিন আহমদ
বধির যবনিকা ও পরম আলোর অনন্ত তৃষ্ণা

রজনীকান্ত সেনের আধ্যাত্মিক ও মরমী গান ‘ওই বধির যবনিকা তুলিয়া মোরে, প্রভু /দেখাও তব চির-আলোক-লোক’ বাংলা ভক্তিকাব্যের অন্তর্লীন আত্মা র এক চিরন্তন আর্তি। এখানে কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে নশ্বর সংসারবদ্ধ জীবনের সীমা ভেঙে পরমাত্মার শাশ্বত আলোকধামে পৌঁছবার ব্যাকুল প্রার্থনা। এ গান শুধু ভক্তির নিবেদন নয়; এটি মানবাত্মার অনন্ত অভিযাত্রার এক করুণ, দীপ্ত ও মহিমান্বিত সংগীত। দৃশ্যমান জড়জগৎ ও অদৃশ্য পরমধামের মধ্যে যেন ঝুলে আছে এক অচঞ্চল, নিস্পৃহ ও নিষ্ঠুর পর্দা। কবি তাকে বলেছেন ‘বধির যবনিকা’। এই যবনিকা শুধু দৃষ্টির আবরণ নয়, শ্রবণেরও অবরোধ। মানুষ পরম আলোর আভাস পায় না, শাশ্বত আহ্বানের ধ্বনিও শুনতে পায় না। ফলে এ পারের জীবন হয়ে ওঠে ব্যথা, আঁধার ও শোকের এক দীর্ঘ প্রবাস; আর ওপার প্রতিভাত হয় অনন্ত সুখ, শান্তি ও অমৃত-আলোর ধামরূপে। এই পৃথিবী কবির দৃষ্টিতে কোনো সুসজ্জিত আশ্রয় নয়; এটি এক দুস্তর, দগ্ধ, মরুময় প্রান্তর। জীবনের পথে মানুষ যেন এক শ্রান্ত পথিক। তার পদে পদে জরা, ক্লান্তি, ক্ষয়, বিচ্ছেদ ও অপূর্ণতার তপ্ত ধূলি। সময় তাকে নিরন্তর তাড়িয়ে নিয়ে চলে, যেন কানে কানে বলে- ‘সর সর’; অর্থাৎ, এখানে স্থিতি নেই, আশ্রয় নেই, চিরবাস নেই। এই সংসার পথ, গন্তব্য নয়; মায়া, পরিণতি নয়।

তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো সেই ক্লান্ত পথিক যখন পরম মিলনের তোরণদ্বারে এসে দাঁড়ায়, তখন তার অন্তরে জাগে এক গভীর প্রশ্ন- এত দীর্ঘযাত্রা, এত ক্ষয়, এত আর্তি, এত আকুলতা কি তবে বিফল হবে? সে কি তবে শূন্য হাতে ফিরে যাবে, বুকে নিয়ে অনন্ত বিয়োগের ক্ষত? এই আর্তির মধ্যেই গানের ভক্তিসৌন্দর্য সর্বাধিক দীপ্ত। কবি রজনীকান্ত সেন তাই প্রভূর কাছে মুক্তি দাবি করেন না; তিনি করুণা প্রার্থনা করেন। কারণ তিনি জানেন, আত্মার বন্ধনমোচনের শক্তি মানুষের হাতে নয়, পরম করুণাময়ের শুভ স্পর্শেই তার পরিত্রাণ।

‘নিঠুর অর্গল’ বা কঠিন খিল এখানে জাগতিক বন্দিত্বের প্রতীক। দেহ, মায়া, অহং, ভয়, বাসনা ও মৃত্যুচেতনার যে কঠোর বন্ধন আত্মাকে ঘিরে রাখে, তা ভাঙতে পারে না সাধারণ মানবপ্রয়াস। তাই কবি প্রার্থনা করেন মহান স্রষ্টার করুণাময় হস্তক্ষেপ। রজনীকান্তের এই প্রার্থনা দুর্বলতার নয়; এটি স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণের মহিমা। ভক্ত এখানে আত্মহীন নয়, বরং আত্মসচেতন; সে জানে তার তৃষ্ণার উৎসও মহান স্রষ্টা, তার তৃপ্তির স্থানও পরম সেই স্রষ্টা। গানের সবচেয়ে গভীর দর্শন নিহিত আছে এই উপলব্ধিতে- মানুষের অন্তরের যে অনন্ত পিপাসা, ভালোবাসার ক্ষুধা, শান্তির আকুলতা, তা কোনো ভ্রম নয়। যিনি সেই পিপাসা দিয়েছেন, তিনিই তার সুধাধারাও ধারণ করে আছেন। জাগতিক সুখ, প্রেম, প্রাপ্তি বা ঐশ্বর্য এই তৃষ্ণা মেটাতে পারে না, কারণ এ তৃষ্ণা ব¯‘জগতের জন্য নয়; এর লক্ষ্য পরম সত্তা। মানুষ যে ভালোবাসা খোঁজে, যে শান্তি চায়, যে পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়, তা আসলে স্রষ্টামুখী আত্মার নিজস্ব স্মৃতি। রজনীকান্তের এই গান তাই মৃত্যুকে অন্ধকার সমাপ্তি হিসেবে দেখে না; বরং দেখে যবনিকা উত্তোলনের এক মহাক্ষণ হিসেবে। এ পারের দুঃখ, অন্ধকার ও বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে ওপারের চির-আলোক-লোকে প্রবেশই এখানে মুক্তির প্রতিমূর্তি। মৃত্যু এখানে বিনাশ নয়, অন্তরাল ভেদ; শেষ নয়, পরম প্রত্যাবর্তন। মূলভাবের রসঘন বিশ্লেষণ : গানে এ পার ও ওপারের দ্বৈততা গভীর করুণ রসে উদ্ভাসিত। এ পার ব্যথা, শোক, আঁধার, ক্লান্তি ও অপূর্ণতার জগৎ; ওপার শান্তি, সুখ, সুধা ও অমৃত-আলোর ধাম। এই বৈপরীত্য কেবল ধর্মীয় কল্পনা নয়, মানবজীবনের অস্তিত্বগত সত্যের রূপক। মানুষ ক্ষণস্থায়ী অথচ তার আকাঙ্ক্ষা অনন্ত; সে দেহধারী অথচ তার তৃষ্ণা দেহাতীত। ‘বধির যবনিকা’ শব্দবন্ধটি অসাধারণ তাৎপর্যময়। যবনিকা সাধারণত দৃষ্টিকে আড়াল করে, কিন্তু এখানে তা বধিরও- অর্থাৎ সে মানবপ্রার্থনা শুনতে পায় না, কিংবা মানুষকেও স্রষ্টার আহ্বান শুনতে দেয় না। এই পর্দা মানুষের অজ্ঞতা, মায়া ও আত্মিক অন্ধতার প্রতীক। কবির প্রার্থনা তাই শুধু দর্শনের জন্য নয়; এটি উপলব্ধির জন্য, জাগরণের জন্য।

গানের অন্তিম আকুলতায় মৃত্যু ভয়াবহ নয়, মুক্তির দ্বার। কবি সংসার থেকে পালাতে চান না; তিনি সংসারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চান। তার প্রার্থনা- নিঠুর অর্গল ভাঙুক, আত্মা মুক্ত হোক, চির-আলোক-লোক উন্মোচিত হোক। এখানে ভক্তিরস ও করুণ রস এক অপরূপ সুষমায় মিলিত হয়েছে।

সারকথা : এই গান আত্মার চিরন্তন যাত্রার গান। এ পারের অন্ধকার, শোক ও অপূর্ণতার মধ্য দিয়ে ওপারের অনন্ত আলোর দিকে মানুষের অগ্রযাত্রাই এর মূল সুর। রজনীকান্ত সেন এখানে শুধু স্রষ্টার কাছে যবনিকা তুলে দেওয়ার আবেদন করেননি; তিনি মানবজীবনের সীমা, বেদনা ও চিরতৃষ্ণাকেও এক মহৎ আধ্যাত্মিক অর্থ দিয়েছেন।

‘পিপাসা দিলে তুমি, তুমিই দিলে ক্ষুধা/তোমারি কাছে আছে শান্তি-সুখ-সুধা’- এই ভাবেই গানের কেন্দ্রে উদ্ভাসিত হয় তার পরম দর্শন। মানুষের আকুলতা বৃথা নয়, তার ব্যথা অনর্থক নয়, তার তৃষ্ণাও অনির্দেশ্য নয়। সব আকুলতার অন্তিম গন্তব্য সেই চির-আলোক-লোক, যেখানে যবনিকা সরে যায়, ব্যথা নীরব হয়, আর আত্মা পরম শান্তির অমৃতযোগে বিলীন হয়ে যায়।

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব বান্দরবান পার্বত্য জেলা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত