প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জুন, ২০২৬
‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য নবজাতকের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও আমরা সেই অঙ্গীকার পালনে প্রায় শতভাগ ব্যর্থ। বর্তমান বাস্তবতায় চোখে পড়ে সেই ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি । শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় শিশুদের হাতে স্মার্টফোন। কোথাও গেলে ফোন লাগবে, খাওয়া করলে ফোন লাগবে, বিনোদনের জন্য ফোন লাগবে ইত্যাদি সবকিছুতেই ফোন । ফোন শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে অভিভাবকদের যুক্তি থাকে, শিশু চুপ থাকে, খাবার খায়, কাঁদে না। কিন্তু এই স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি হয় দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ। তা আমরা হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। যেমন- অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়। ফোনে রিলস দেখায় যে মস্তিষ্ক একটানা পাঁচ বা দশ সেকেন্ডের বেশি কোনো বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, সে মস্তিষ্ক বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর হবে? এছাড়া রয়েছে ঘুমের সমস্যা। ফোনের নীল আলো মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নিঃসরণে বাধা দেয়, যা ঘুমের জন্য অপরিহার্য। দেরিতে ঘুমানো, কম ঘুমানো এবং ক্লান্ত হয়েই স্কুলে যাওয়া। ফিরে এসে আবার সেই একই অবস্থায়।
এই চক্রে আটকে পড়ছে লক্ষ লক্ষ শিশু। এভাবেই অল্প বয়সেই ফোন হাতে দিয়ে অভ্যাসে পরিণত করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাচ্ছে এই প্রজন্ম। নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ। গবেষকদের মতে, শিশু জন্মের পর থেকে অন্তত ৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটতে থাকে। এর সঙ্গে অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও মেধা বাড়ানোয় সন্তানদের ধরিয়ে দিতে হবে কিছু অভ্যাস ও অনুশীলন। কিন্তু আমরা ধরিয়ে দিচ্ছি স্মার্ট ফোন।
এরপর গেম বা রিলস। এরপর চলতে থাকে সারাদিন। সরিয়ে দিচ্ছি প্রকৃতি থেকে, ডুবিয়ে দিচ্ছি কৃত্রিমতায়। লাভের থেকে লোকসানের দিকেই এগিয়ে দিচ্ছি। বুদ্ধিমত্তা বা মেধার বিকাশ ঘটানোর পরিবর্তে মস্তিষ্ক শূন্য করে দিচ্ছি। এভাবেই মেধাহীন, বুদ্ধিহীন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোনো সচেতনতা নেই। থাকলেও নগন্য।
পূর্বে মায়েরা শিশুদের ভাত খাওয়াইতো বিভিন্ন ধরনের রাজা-রানি, রাজা-বাদশা, রাক্ষস ইত্যাদি গল্প বলে, বিভিন্ন ধরনের নতুন জিনিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে, বিভিন্ন ভাবে। ঘুম পারিয়ে দিতো গল্প বলে, বিভিন্ন ঘুমপাড়ানি গান বলে। বিনোদনের জন্য মাঠে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করে, ঘুরতে গিয়ে। যার ফলে শিশুরা নতুন কিছু জানতে পারতো, শিখতে পারতো।
কিন্তু স্মার্ট ফোন আসার পর এগুলো বিলুপ্তির পথে। এখন বাচ্চাদের ভাত খাওয়ানো হয় ফোনে রিলস বের করে দিয়ে। বিনোদনের জন্য রিলস। একসময় বিকালের মাঠ ছিল শিশুদের সামাজিক শিক্ষার জায়গা। সেখানে দল বেঁধে খেলতে গিয়ে শিশু শিখত নেতৃত্ব, আপোষ, হার মানা, আবার উঠে দাঁড়ানো। এই অভিজ্ঞতাগুলো কোনো ফোন বা কোনো অ্যাপস শেখাতে পারে না।
এখন সবকিছু ফোনেই সীমাবদ্ধ। রিলসে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে বাচ্চা থেকেই। এরপর ঘন্টার পর ঘন্টা বাচ্চাদের হাতে ফোন। ঘন্টার পর ঘন্টা রিলস দেখতেছে। কেউ গেমে আসক্ত। গেম খেলতেছে। কিন্তু অবিভাবকেরা নিশ্চুপ। ফোন কেড়ে নিলে বাচ্চা কান্না শুরু করে। যার জন্য ফোন নিতে পারে না। এভাবে অবিভাবকেরাই বাচ্চাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
পূর্বে একটা সময়ে সকাল হলে গ্রাম-মহল্লা থেকে কুরআন শরীফ পড়ার আওয়াজ শোনা যেত। মায়েরা বাসায় পড়তো এবং গ্রামের মক্তবে মুসলিম বাচ্চাদের পাঠানো হতো। সেখানে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় মৌলিক বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তা আর দেখা যায় না। এখন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ মস্তিষ্কে ফোন হাতে নেয় । এরপর রিলস নয়তো গেম। এরপর সারাদিন এভাবে কেটে যায়। না ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়, না অন্য কিছু। কিন্তু অবিভাবকদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অবিভাবকেরাই ফোন সহজলভ্য করে দিয়েছে। এভাবে প্রতিনিয়ত রিলস বা গেমের মাধ্যমে বাচ্চাদের ডোপামিন নিঃসরণ হচ্ছেই। মস্তিষ্ক শূন্য থেকে শূন্য হচ্ছে কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেই।
তবে এই সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তির নয়, কাঠামোরও। বর্তমান নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ কমে গেছে, নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। অভিভাবকেরা বাচ্চাদের সময় দিতে পারে না নানা ব্যবস্ততায়। তাই বাচ্চাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী অভিভাবকরাই। অভিভাবকরাই এইদিকে যেমন ফোন সহজলভ্য করে দিয়েছে অন্য দিকে তারাই বাচ্চাদের সামনে রিলস বা গেম খেলে। এভাবে তাদের থেকে শিখে বাচ্চারা শিখে যায়। কেননা বাচ্চারা হয় অনুকরণ প্রিয়। বড়দের থেকে শিখে। ফোন দেওয়ার পরে পরবর্তীতে আর বাচ্চাদের থেকে ফোন নেওয়ার সুযোগ থাকে না। বাচ্চা কান্না করলে ফোন হাতে দেয়, ভাত না খেলে ফোন হাতে দেয়, কথা না শুনলে ফোন হাতে দেয়,। ফোন হাতে দিয়েও ক্ষান্ত থাকে না, অবিভাবকরাই রিলস বা গেম বের করে দেয়। ফোন থেকে দূরে রাখতে হবে । এর জন্য বাচ্চাদের সামনে ফোন ব্যবহার না করা। আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের অনেক শিশুতোষ গ্রন্থ রয়েছে।
সেগুলো কিনে বাচ্চাদের পড়ার অভ্যাস করা।
মাঠে খেলাধুলার ব্যবস্থা করে দেওয়া। বেড়ে উঠার জন্য সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা করা। বাচ্চাদের ছোট থেকেই নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। পরবর্তী প্রজন্মকে মেধাবী ও বুদ্ধিমান করে গড়ে তুলতে দরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এই ধ্বংসের হাত থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে পরিবারকে।
বিশেষ করে মা-বাবা। মা-বাবাকে নিজেদের ফোন ব্যবহার বিশেষ করে বাচ্চাদের সামনে কমাতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে, তাদের সাথে গল্প করতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমাদের কবি সাহিত্যিদের অসংখ্য শিশুতোষ গ্রন্থ রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এছাড়া বিকালে মাঠে নিয়ে যেতে হবে।
এইসব ব্যাপারে যত সচেতন হতে পারবো ততই নিজেদের জন্য মঙ্গল। সচেতন না হলে আগামী দিনে আমরা হয়তো এমন এক প্রজন্ম পাব, যারা তথ্যপ্রযুক্তিতে হয়তো দক্ষ হবে, কিন্তু তাদের মধ্যে থাকবে না কোনো মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সামাজিকতাবোধ কিংবা সৃজনশীলতা। এরকম কোনো একটি পঙ্গু ও বিবেকহীন প্রজন্ম নিয়ে কোনো জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া