ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দাসত্ব ও মেরুদণ্ডহীনতার এক সমসাময়িক আখ্যান

মমতাজ উদ্দিন আহমদ
দাসত্ব ও মেরুদণ্ডহীনতার এক সমসাময়িক আখ্যান

কাজী নজরুল ইসলাম যখন ১৯৩৩ সালে তার বিখ্যাত ব্যঙ্গগান ‘বাঙালিবাবু’ রচনা করেছিলেন, তখন তিনি শুধু একটি সময়ের সামাজিক চরিত্রচিত্রণ করেননি; বরং বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মিক সংকটের এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। তার কলমের নিবে ফুটে উঠেছিল এমন এক শ্রেণির মানুষ, যারা জীবিকার বিনিময়ে ধীরে ধীরে বিসর্জন দিয়েছে আত্মমর্যাদা, আরামণ্ডআয়েশের বিনিময়ে সমর্পণ করেছে মেরুদণ্ড। প্রায় এক শতাব্দী পরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সেই গান কোনো অতীতের দলিল নয়; বরং বর্তমানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক নির্মম আয়না।

আলীকদমের সাম্প্রতিক প্রেসক্লাব দখলকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো সেই আয়নায় আমাদের মুখ আরও স্পষ্ট করে তোলে। শাসকের মুখ বদলেছে, পতাকার রং বদলেছে, প্রশাসনিক অভিধানও বদলেছে; কিন্তু ক্ষমতার কাছে নতজানু হওয়ার প্রবণতা, চাকরির নিরাপত্তার বিনিময়ে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি এবং মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে রাখার অভ্যাসটি বিস্ময়করভাবে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

নজরুলের ‘বাঙালিবাবু’ ছিল বাহ্যিকভাবে ম্যালেরিয়ায় জীর্ণ, কাশিতে কাতর এবং দৈহিক দুর্বলতায় ক্লিষ্ট; কিন্তু কবির দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছিল তার চেয়েও গভীর এক রোগের দিকে-আত্মার ক্ষয়রোগ। তিনি বুঝেছিলেন, যে মানুষের নখ নেই, দন্ত নেই, প্রতিবাদের সাহস নেই, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি দারিদ্র্য নয়, বরং আত্মসম্মানহীনতা। তাই তার ব্যঙ্গের লক্ষ্য ছিল শরীর নয়, মানসিক দাসত্ব।

আজকের পৃথিবীতে সেই বাবুর রূপ পাল্টেছে, কিন্তু স্বভাব পাল্টায়নি।

এখন সে কর্পোরেট দালানের কাচঘেরা কক্ষে বসে থাকে, অথবা সরকারি ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে। তার হাতে হয়তো আধুনিক প্রযুক্তি, মুখে উন্নয়নের ভাষণ, কিন্তু অন্তরে এখনও সেই পুরোনো ভৃত্যসুলভ মানসিকতা। ফলে যেখানে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করা, সেখানে যদি তিনি নিজেই প্রেসক্লাবের মতো স্বাধীন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব কায়েমের প্রয়াস নেন, তবে সেটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়; বরং আত্মিক দৈন্যের নগ্ন প্রকাশ।

ক্ষমতাবান মানুষের অনেক দম্ভ থাকে, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর দম্ভ সেই, যা জন্ম নেয় ভেতরের ভীরুতা থেকে। আলীকদমের ঘটনাটি সেই ভীরু দম্ভেরই একটি প্রতীক। কারণ সত্যিকার শক্তি কখনও স্বাধীন কণ্ঠকে দমন করতে চায় না; দমন করতে চায় কেবল সেই শক্তি, যার আত্মবিশ্বাস নেই। যে ব্যক্তি সাংবাদিকতার মতো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে পদানত করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সে আসলে নিজের অনিরাপত্তাবোধকেই প্রকাশ করে।

নজরুল লিখেছিলেন, ‘গোলামের কুড়ি ফোটার এ বোঝা/নামায়ে কোমর হতে দাও সোজা’। আজকের যুগের সেই নব্য-কেরানি বাবুরা কি কোমরের সেই কুঁজো ভাবটা ছাড়তে পেরেছেন? কক্ষনও না। এই আহ্বান তার সময়ের জন্য ছিল না; আজও তার আবেদন সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের সমাজে এখনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা ব্যক্তিগত সুবিধা, পদোন্নতি কিংবা প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য সত্যকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। আলীকদমে সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের উদ্দেশ্যে প্রেসক্লাব দখলের যে হীন প্রয়াস দেখা গেল, তা মূলত ক্ষমতার প্রকাশ নয়; বরং ভীরু, কুঁজো মাঠ কর্মকর্তা সত্য বলতে ভয়ের প্রকাশ। যে ভয় স্বাধীন চিন্তাকে ভয় পায়, প্রশ্নকে ভয় পায়, মুক্ত সাংবাদিকতাকে ভয় পায়। নজরুলের ব্যঙ্গচিত্রে রোববার ছিল অলসতা ও অকর্মণ্যতার দিন। আজকের যুগে সেই অলসতার রূপ বদলেছে; কিন্তু আত্মবিস্মৃতির প্রকৃতি বদলায়নি। এখন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে, কৃত্রিম বিনোদনের নেশায় কিংবা নিরাপদ নীরবতার আশ্রয়ে নিজের অস্তিত্বকে ক্রমশ ক্ষয় করে। ফলত ব্যক্তি-সত্তা বিলীন হয়ে যায়, বিবেকের স্থান দখল করে সুবিধাবাদ। আর তখনই ক্ষমতার ক্ষুদ্র স্বৈরাচারীরা সমাজকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে ভাবতে শুরু করে। তারা জানে, ভয়ই তাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি। কারণ যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ সহজেই বশ্যতা শিখে ফেলে। যে মানুষ নিজের মর্যাদা রক্ষার সাহস হারায়, সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিও হারায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ব্যঙ্গে ছিল হাসির আবরণ; কিন্তু নজরুলের ব্যঙ্গে ছিল অগ্নিদগ্ধ ক্ষতের যন্ত্রণা। তিনি শুধু বিদ্রূপ করেননি, বাঙালির আত্মমর্যাদাবোধকে নাড়া দিতে চেয়েছিলেন। তাই তার ‘বাঙালিবাবু’ গান আজও আমাদের বিব্রত করে, কারণ আমরা এখনও তার ভেতর নিজেদেরই ছায়া দেখতে পাই।

আলীকদমের প্রেসক্লাব দখলকাণ্ড সেই ছায়াটিকেই আবার দৃশ্যমান করেছে। ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ঔপনিবেশিকতা শুধু রাজনৈতিক শাসনের নাম নয়; এটি একটি মানসিক অবস্থাও। রাষ্ট্র স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু মন যদি স্বাধীন না হয়, তবে দাসত্বের শৃঙ্খল অদৃশ্য হয়েও বহাল থাকে। প্রশ্ন তাই একটিই- আমরা কি এখনও নখণ্ডদন্ত-বিহীন সেই ‘বাঙালিবাবু’ হয়েই থাকব, নাকি কোমর সোজা করে দাঁড়াব? আমরা কি ভয়ের সংস্কৃতিকে মেনে নেব, নাকি স্বাধীন বিবেকের পক্ষে অবস্থান নেব?

এই প্রশ্নের উত্তর বাইরে কোথাও নেই। এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের প্রত্যেকের শিরদাঁড়ায়, আমাদের বিবেকে, আমাদের নাগরিক সাহসে। কারণ দাসত্বের শৃঙ্খল বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তা ভাঙার শক্তি জন্ম নেয় অন্তর থেকেই। আর যদি নজরুলের বিদ্রোহী আত্মার সামান্য স্ফুলিঙ্গ এখনও আমাদের রক্তে অবশিষ্ট থাকে, তবে একদিন এই নব্য-দাসত্বের অন্ধকারও ছিন্ন হবে, এবং মানুষ আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখবে।

মমতাজ উদ্দিন আহমদ

সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত