প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ জুন, ২০২৬
‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ,
মস্ত অফিসার,
মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা
এপার-ওপার।’
কবি নির্মলেন্দু গুণের এই পঙ্ক্তিগুলো যেন আজকের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মস্ত ফ্ল্যাটের এপার-ওপার দেখা না গেলেও, সেই বিশাল বাসস্থানের কোনো এক কোণে অনেক সময় জায়গা হয় না বৃদ্ধ মা-বাবার। একসময় যাদের স্নেহ, ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রমে সন্তান বড় হয়ে ওঠে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের কাছেই তারা হয়ে ওঠেন অবহেলিত। তখন বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তাদের শেষ আশ্রয়। বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মধ্যে বসে প্রবীণ মানুষগুলো স্মৃতির পাতায় ফিরে যান। মনে পড়ে সন্তানের শৈশব, নাতি-নাতনিদের মুখ, পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্তগুলো। জীবনের যে সময়টা কাটার কথা ছিল পরিবারের সান্নিধ্যে, গল্প আর হাসির উষ্ণতায়, সেই সময়ই তাদের কাটাতে হয় একাকিত্বের দীর্ঘ ছায়ায়। জানালার পাশে বসে হয়তো তারা দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর নীরবে নিজের কষ্টগুলো প্রকৃতির কাছে সমর্পণ করেন। পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জীবনযাত্রাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির প্রসার, নগরায়ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবনের চাপে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে। ফলে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের জন্য সময় ও মনোযোগ ক্রমশ কমে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা কর্মব্যস্ততার কারণে চাইলেও বাবা-মায়ের পাশে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও একটি বড় কারণ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে প্রবীণ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, ওষুধ এবং বিশেষ যত্নের খরচ বহন করা অনেকের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সমস্যাটি কেবল অর্থনৈতিক নয়। অনেক সময় উচ্চবিত্ত পরিবারেও দেখা যায়, অর্থের অভাব না থাকলেও মানবিকতার অভাব রয়েছে। সন্তানরা মা-বাবার গড়ে দেওয়া ছোট্ট ঘরকে বিলাসবহুল অট্টালিকায় রূপান্তরিত করতে পারলেও, সেই অট্টালিকার ভেতর মা-বাবার জন্য সময়, সঙ্গ কিংবা আন্তরিকতার জায়গা তৈরি করতে পারে না। ফলে তারা হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গতা ও মানসিক অবহেলার শিকার। অবশ্য বাস্তবতার আলোকে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তাকেও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। এমন অনেক প্রবীণ আছেন যাদের দেখাশোনার মতো কেউ নেই, কিংবা যাদের বিশেষ চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে একটি সুপরিচালিত বৃদ্ধাশ্রম তাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা এবং সমবয়সীদের সান্নিধ্য নিশ্চিত করতে পারে। তাই বৃদ্ধাশ্রমের অস্তিত্বকে এককভাবে নেতিবাচক বলা যায় না। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- বৃদ্ধাশ্রম কি সত্যিই আমাদের প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত? শৈশবে সন্তান অসুস্থ হলে কোনো মা-বাবা কি সময় বা অর্থের অজুহাতে তার দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন? সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তারা নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা এবং আরামণ্ডআয়েশ বিসর্জন দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। তাহলে বার্ধক্যের সেই অসহায় সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো কি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব নয়? প্রবীণ মানুষের জন্য পরিবারের ভালোবাসা, আপনজনের সান্নিধ্য এবং আত্মিক বন্ধনের বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। আইন কিংবা সামাজিক চাপ দিয়ে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়; এটি আসে পারিবারিক শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং মানবিক চর্চা থেকে। তাই প্রয়োজন পরিবারে নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিকাশ। আমাদের মনে রাখতে হবে, সময়ের চাকা কখনো থেমে থাকে না। আজ আমরা আমাদের মা-বাবার সঙ্গে যে আচরণ করছি, আগামী প্রজন্ম তা-ই শিখছে। একদিন আমরাও বার্ধক্যে উপনীত হব, আমাদেরও প্রয়োজন হবে সন্তানের সান্নিধ্য, ভালোবাসা এবং যত্ন। তাই অট্টালিকার জৌলুস নয়, পরিবারকেই করে তুলতে হবে প্রবীণদের শেষ বয়সের নিরাপদ আশ্রয়। বৃদ্ধাশ্রম যেন কোনো মা-বাবার বাধ্যতামূলক গন্তব্য না হয়; বরং পরিবারের ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতাই হোক তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আতিক হাসান তন্ময়
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়