প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ জুন, ২০২৬
১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসের এক বিষণ্ণ সন্ধ্যা। ফুসফুসের মারণব্যাধি যক্ষ্মায় আক্রান্ত এক শীর্ণকায় মানুষ জানালার পাশে বসে বিষাদগ্রস্ত বাতাসে হাত বাড়িয়েছিলেন; যার জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে আসতে বাকি ছিল আর মাত্র চার বছর। দ্বিতীয় প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তীব্র শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় বিপর্যস্ত মানুষটি সেদিন কাগজের বুকে কলম নামিয়েছিলেন নিজের কর্তৃত্বপরায়ণ বাবার উদ্দেশে এক দীর্ঘ চিঠি লিখতে। সেখানে তিনি অকপটে ফুটিয়ে তুলেছিলেন বাবার প্রতি তার ভীতির বিশাল পরিধি। নিজের লেখার প্রতি চরম আত্মবিশ্বাসহীন এই মানুষটি মৃত্যুর আগে তার একমাত্র বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে অনুরোধ করেছিলেন- তার সমস্ত চিঠিপত্র ও অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি যেন আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু নিয়তির পরিহাস ও বন্ধুর সাহিত্যিক দূরদর্শিতায় সেই লেখাগুলো ভস্মীভূত হওয়ার বদলে বিশ্বদরবারে প্রকাশিত হয়, যা বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। মাত্র ৪০ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা অন্তর্মুখী সেই মানুষটি রাতারাতি রূপান্তরিত হন আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থপতিতে- যার নাম ফ্রানৎস কাফকা। বাংলার বুকে জীবনানন্দ দাশ যেভাবে তার অমূল্য সৃষ্টিগুলোকে কালো ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখেছিলেন, কাফকাও তেমনি তার অধিকাংশ লেখা লুকিয়ে রেখেছিলেন ড্রয়ারের অন্ধকারে। তিনটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, গুটিকয় ছোটগল্প, কিছু চিঠি ও দিনপঞ্জির সংক্ষিপ্ত পরিসরে তৈরি কাফকার এই সাহিত্যসম্ভার আজ এক শতাব্দী পরেও সাধারণ পাঠকের মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে।
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ফ্রানৎস কাফকার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা কেবল তার সাহিত্যিক সুনামের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয় না; বরং এর পেছনে রয়েছে এক অকাট্য ও বিস্ময়কর পরিসংখ্যানিক ভিত্তি। এ যাবৎকালে বিশ্বজুড়ে সাহিত্যে যতজন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের লেখার ওপর কাফকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের কথা অকপটে ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ উইলিয়াম শেকসপিয়ারের পর আর কোনো একক সাহিত্যিককে নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত বিপুল পরিমাণ আলোচনা ও বিশ্লেষণ হয়নি, যতটা হয়েছে কাফকাকে ঘিরে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই কাফকা ও তার সৃষ্টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক গবেষণাগ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচিত হয়েছে, যা যেকোনো লেখকের জন্যই এক বিরল ও অবিশ্বাস্য কীর্তি। মানবজীবনের তীব্র একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতাবোধ, অস্তিত্বের সংকট, অপরাধবোধ এবং অদ্ভুত অর্থহীনতার (Absurdity) এমন এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংশ্লেষ তিনি ঘটিয়েছিলেন যে, তার লেখার এই অনন্য ও দুর্বোধ্য ধরনকে ব্যাখ্যা করতে বিশ্বসাহিত্যের অভিধানে যুক্ত করতে হয়েছে ‘কাফকায়েস্ক’ (Kafkaesque) নামক এক নতুন পরিভাষা। কাফকা শুধু গল্পই বলেননি, বরং আধুনিক মানুষের ভেতরের অবদমিত যন্ত্রণা ও চিরন্তন একাকিত্বকে এমন এক সর্বজনীন রূপ দিয়েছেন, যা কালের সীমানা পেরিয়ে আজও মানবমনকে সমানভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে।
কাফকার নাম উচ্চারণ করলেই যে অবিনশ্বর সৃষ্টির কথা অবলীলায় মনে পড়ে যায়, তা হলো তার বিখ্যাত ও অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘দ্য ট্রায়াল’। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জোসেফ কে নামক একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা। এক সকালে ঘুম থেকে জেগে তিনি আবিষ্কার করেন, কোনো কারণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই দুজন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। অদ্ভুত বিষয় হলো, তাকে কোনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় না; বরং বলা হয়- তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন, তবে খুব শিগগিরই তার বিচার বা ‘ট্রায়াল’ শুরু হবে।
নিজের অজ্ঞাত অপরাধের এই অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক বোঝা ও অন্তহীন অপেক্ষা জোসেফ কে-কে ক্রমশ এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয় এবং একপর্যায়ে তার সাজানো-গোছানো জীবন ও চাকরি- দুটোই ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। জোসেফ কে-র এই চরম বিপর্যয় মূলত আধুনিক মানুষের সেই অস্তিত্ব সংকটেরই এক প্রতীকী রূপ, যেখানে প্রাচীন রোমের স্টোয়িক দার্শনিক সেনেকার বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে যায়- ‘আমরা বাস্তবের চেয়ে কল্পনায় বেশি কষ্ট পাই।’ ফরাসি লেখক আলবেয়ার কামু তার ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’-এ জীবনের অর্থ না খুঁজে স্রেফ এগিয়ে যাওয়ার যে কথা বলেছেন, জোসেফ কে তা করতে পারেননি। এর পরিবর্তে তিনি জঁ-পল সার্ত্রের ‘অন্যদের দৃষ্টি’ (The Gaye of Others) এবং মিশেল ফুকোর ‘সামাজিক নজরদারি’ তত্ত্বের গোলকধাঁধায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন, যেখানে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন সমাজের তামাশায় রূপান্তরিত হয়। আমরাও কি প্রতিদিন লোকনিন্দার ভয়ে এমন এক অদৃশ্য ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না ঠিক যেভাবে জনপ্রিয় কল্পকাহিনির চরিত্র টাইরিয়ন ল্যানিস্টার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি তার পুরো জীবনটাই এক অন্তহীন বিচারের মুখোমুখি কাটিয়েছেন!
কাফকার ব্যক্তিজীবনের জটিলতা এবং তার সৃষ্টির গভীরতা যে একই সুতোয় গাঁথা ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে তার অমর সৃষ্টি ‘দ্য মেটামরফোসিস’ উপন্যাসিকায়। এর নায়ক গ্রেগর সামসা এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, তিনি এক বিশাল ও কুৎসিত পোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন। এর ফলে রাতারাতি তার প্রতি পরিবারের ভালোবাসা ঘৃণায় এবং আশ্রয় আশঙ্কায় পরিণত হয়। গ্রেগরের এই রূপান্তর এবং পরিবারের নির্মম আচরণ মূলত কাফকার নিজ জীবনেরই এক বেদনার্ত প্রতিফলন। তার পিতা হারমান কাফকা ছিলেন চরম কর্তৃত্বপরায়ণ ও কঠোর শাসক, যিনি দুর্বল ও অন্তর্মুখী কাফকাকে নিজের মতো করে গড়তে চেয়েছিলেন। বাবার চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করে কাফকাকে আইন পড়তে হয়েছিল এবং চাকরির ফাঁকে লুকিয়ে লিখতে হয়েছিল তার অসাধারণ সব কালজয়ী সাহিত্য। মনোবিজ্ঞানের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ অপরিচিত বিষয়ের মুখোমুখি হলে যে ভয় পায়, তা পরবর্তীতে ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়- যা আমরা গ্রেগরের পরিবারের আচরণের মধ্যে স্পষ্ট দেখতে পাই। অষ্টাদশ শতাব্দীর চিন্তাবিদ জেরেমি বেনথামের উপযোগবাদ তত্ত্বের আলোকে, সমাজ যখন সামষ্টিক সুবিধার জন্য ব্যক্তিমানুষকে শৃঙ্খলিত করে, তখন জন্ম নেয় ‘লজ্জার সংস্কৃতি’ বা ‘কনসেপ্ট অব শেম’। সামাজিক এই বাধ্যবাধকতার কারণেই যে প্রতিভাবান মানুষেরা আপন মহিমায় বিকশিত হতে পারেন না, তা বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশেও উল্লেখ করেছিলেন। উপন্যাসের শেষ ভাগে বাবার ছুড়ে মারা আপেলের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে একপর্যায়ে গ্রেগরের যে করুণ মৃত্যু ঘটে, তা অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করে- সমাজ ও পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশার নির্মম বোঝা কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের অস্তিত্বকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
অনেকে কাফকার লেখাকে অবাস্তব, পরাবাস্তব বা দুর্বোধ্য বলে আখ্যায়িত করলেও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কাফকা আসলে ছিলেন তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক দূরদর্শী বাস্তববাদী লেখক। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে ১৯৫৬ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়ন হাঙ্গেরির গণ-আন্দোলন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর, বুদাপেস্ট থেকে বিখ্যাত হাঙ্গেরীয় দার্শনিক গিয়র্গি লুকাসকে গ্রেপ্তার করে রোমানিয়ার এক দুর্গে বন্দি করে রাখা হয়। লুকাসকে তার অপরাধের কথা না জানিয়ে শুধু বলা হয়েছিল যে, তার সমস্ত আইনি অধিকার বহাল রয়েছে! এ কথা শুনে লুকাস তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করেছিলেন- কাফকার উপন্যাসের পরাবাস্তবতাই আসলে চরম বাস্তব। কাফকার এই গভীর জীবনদর্শন ও লেখার অনন্য শৈলী পরবর্তীতে বিশ্বসাহিত্যের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির ‘কাফকা অন দ্য শোর’, আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদ, হোর্হে লুইস বোর্হেসের পরাবাস্তববাদ কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’- সবকিছুর পেছনেই কাফকা এক অবিসংবাদিত অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। কাফকা নিজেই একবার লিখেছিলেন, ‘আমাদের শুধু সেই বইগুলোই পড়া উচিত, যা আমাদের ভেতরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং জমে থাকা বরফকে কুঠারের মতো আঘাত করে ভেঙে ফেলে।’ আজ একবিংশ শতাব্দীর এই যান্ত্রিক যুগেও যখন মানুষ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সামাজিক নজরদারি এবং তীব্র একাকিত্বের গোলকধাঁধায় দিশেহারা, তখন কাফকা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন; আর মনে করিয়ে দেন তার সেই বিখ্যাত অস্ফুট আক্ষেপ ‘একটি খাঁচা যেন উন্মুখ হয়ে একটি পাখির খোঁজ করে বেড়াচ্ছে।’
আমানুর রহমান
কবি ও লেখক, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ