ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিপর্যয়ের শঙ্কায় রাজধানী ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় চাই মহাপরিকল্পনা

বিপর্যয়ের শঙ্কায় রাজধানী ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় চাই মহাপরিকল্পনা

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘনঘন মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন আমাদের অমঙ্গলের বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা দেশের আবাসন ও নগর পরিকল্পনার এক কঙ্কালসার চিত্র আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দেশে ১৫০ থেকে ২০০ বছরের চক্র অনুযায়ী আগামী যে কোনো সময়ে ৭ বা তার চেয়ে অধিক মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। আর এমনটি হলে শুধু ঢাকাতেই ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে প্রাণ হারাতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ। এই বিশাল প্রাণহানির পাশাপাশি যে মাত্রার অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, তা সামলানোর সক্ষমতা বর্তমান বাংলাদেশের নেই। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকৌশলবিদ্যার সেই অমোঘ সত্যটি আজ আমাদের মনে করার সময় এসেছে- ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।

পরিতাপের বিষয়, সরকার ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বলতে মূলত ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন কিংবা উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি কেনাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। অথচ মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ছিল ভবন নির্মাণ ও সুরক্ষায়। জাইকা ও সিডিএমপির জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার ৪ তলার ওপরের প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবনের অন্তত ৪০ শতাংশই চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিপুলসংখ্যক ভবনকে চিহ্নিত না করে কিংবা সুরক্ষার আওতায় না এনে শুধু উদ্ধারকারী দল দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করার চিন্তা অবাস্তব। কাজেই আফটার দ্য ডিজাস্টার বা দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার চেয়ে বিফোর দ্য ডিজাস্টার বা দুর্যোগপূর্ব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরই এখন রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ নীতিগত জোর দিতে হবে।

এই আসন্ন মহাবিপর্যয় থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট, সময়াবদ্ধ ও কার্যকর রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নামতে হবে। প্রথমত, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি কর্পোরেশনকে যৌথভাবে ঢাকার ১৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে জোনভিত্তিক ভাগ করে প্রতিটি বহুতল ভবনের দ্রুত রেডিয়োমেট্রিক ও স্ট্রাকচারাল সেফটি অডিট সম্পন্ন করতে হবে। কোন ৭২ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তা লাল তালিকাভুক্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করাও জরুরি। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে ভেঙে ফেলার চেয়ে রেট্রোফিটিং বা বিশেষ প্রকৌশল পদ্ধতিতে মজবুত করার ওপর জোর দিতে হবে। তৃতীয়ত, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক বা নকশা অনুমোদনকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ভবনের গুণগত মান যাচাইয়ে থার্ড পার্টি ভেরিফিকেশন বা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ দ্বারা অডিট বাধ্যতামূলক করাও এখন সময়ের দাবি। চতুর্থত, আমাদের স্থপতি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এর ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি বারবার আমাদের সতর্ক করছে এবং এই সতর্কবার্তা অবহেলার পরিণতি হবে আত্মঘাতী। বহুতল ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য সফট স্টোরি বা দুর্বল কাঠামোগত নকশা এবং যত্রতত্র আবাসন নির্মাণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা এখনই কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে- এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত