প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০১ জুলাই, ২০২৬
কাগজের সঙ্গে জড়িত কারো শৈশব, কারও সাফল্য, কারও জীবনযুদ্ধের লড়াই। বাংলাদেশের মুদি দোকান, অফিস, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে সরকারি নথিপত্রে কাগজের ব্যবহার সর্বত্র, অথচ নীরব। এই নীরব শিল্পের পেছনে মূর্তিমাণ লাখ লাখ মানুষের জীবন, বেঁচে থাকার লড়াই। কারখানা শ্রমিক থেকে কাঁচামাল সংগ্রহকারী, মুদ্রণ ব্যবসায়ী থেকে বাঁধাই কারিগর, সকলের ঘামে গড়ে উঠেছে আজকের কাগজশিল্প।
কাগজ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে। পঞ্চাশের দশকে এদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠে কর্ণফুলী পেপার মিল (১৯৫৩) এবং খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল (১৯৫৯)। নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতেও কাগজকলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ সালের পর থেকে শুধুমাত্র আমদানিনির্ভর এই কাগজশিল্প দেশীয় চাহিদা পূরণ করে রপ্তানিতে এগিয়ে আসে।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (BPMA) তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা এবং ২৫ লাখেরও বেশি মানুষ এতে কর্মরত। বর্তমানে দেশে কাগজশিল্পকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো সহায়ক শিল্প গড়ে উঠেছে- যেমন মুদ্রণ, প্রকাশনা, কালি তৈরি, সাজসজ্জা, প্যাকেজিং ও বাঁধাই শিল্প।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই কাগজ শিল্পের প্রতি। নিয়মিত পড়াশোনা, বোর্ড পরীক্ষা, অনার্স, মাস্টার্স পরীক্ষা- এই সব কোনো কিছুই কাগজ ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। আধুনিক যুগে এসেও নথিপত্র, তথ্য, সংবিধান- প্রায় সকল ক্ষেত্রে কাগজ ছাড়া চলা অসম্ভব। এ ছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার, যাদের আধুনিক ডিভাইস কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য কাগজ তৈরি করে দিয়েছে শিক্ষার স্বাদ গ্রহণের অনবদ্য সুযোগ। তাই কাগজশিল্পকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমানে কাগজের পর্যাপ্ততা সত্ত্বেও এই শিল্প নীরব কিছু সংকটের সম্মুখীন।
বাংলাদেশের কাঠামোগত বাধা কাগজশিল্পের অন্যতম মৌলিক সমস্যা। দেশে কাগজের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অনেক বেশি। এর ফলে বাজারে তৈরি হয় তীব্র প্রতিযোগিতা, কাগজের মূল্য হ্রাস ও কম মুনাফাজনিত ক্ষতি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হলেও ভুক্তভোগী হয় শ্রমিক ও কাঁচামালের সরবরাহকারীরা। একই সঙ্গে এটি যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি উৎপাদিত হয়, তাই অনেক বিনিয়োগ বিফলে যায়। এই সংকটের কারণ মূলত, সঠিকভাবে বাজার চাহিদা বিশ্লেষণের অভাব, ব্যবসায়ীদের অসততা, নিম্নমানের আমদানি পণ্যের প্রতি ঝোঁক ও অন্যান্য নানান অব্যবস্থাপনা। এ ধরনের অনিয়ম ও প্রতিযোগিতার নেশা কমিয়ে আনছে কাগজের মান ও ভোক্তার আস্থা। এর ফলে বিক্রি কমে যায় ও কাগজশিল্প ক্ষতির চাকা ঘুরতেই থাকে।
কাগজ উৎপাদন একটি শক্তিনিবিড় প্রক্রিয়া। এর প্রধান শক্তি আসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে। অথচ বাংলাদেশ আজ গভীর জ্বালানি সংকটে। Petrobangla I EMRD এবং Energy Tracker Asia-র মে ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন ২০১৮ সালে ২,৫০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট থেকে কমে এখন ১,৭০০-১,৮০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুটে নেমেছে। আমদানি করা এলএনজি যোগ করলে মোট সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ২,৬৫০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট, অথচ প্রকৃত চাহিদা ৪,০০০ মিলিয়নেরও বেশি। তাই, চরম গ্যাস-নির্ভরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কাগজ শিল্পে।
সম্প্রতি ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পক্ষেত্রগুলো কোণঠাসা প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। কাগজশিল্প এর ব্যতিক্রম নয়। একদিকে তারা কাগজ বিক্রি করতে পারছে না, অপরদিকে ব্যাংকে ঋণ ও সুদের চরম বোঝা। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানিতে বিধিনিষেধ এবং এলসি খুলতে ব্যাংকের অনীহা- এই বাহ্যিক অর্থনৈতিক চাপগুলো কাগজ শিল্পকে বিপাকে ফেলেছে। সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এই সুবিধায় আনা কাগজ খোলাবাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় দেশীয় উৎপাদকদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পাশাপাশি নিউজপ্রিন্ট ও প্রকাশনা কাগজের চাহিদা ডিজিটাল রূপান্তর ও কোভিডকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিঘ্ন, সাধারণ ছুটি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেমে যাওয়ায় বিভিন্ন পেপার মিলসের রাজস্ব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। বাংলাদেশের কাগজ উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো বাঁশ, মিশ্র হার্ডউড এবং পুনর্ব্যবহৃত তন্তু। বাঁশ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রাচুর্যময়, দ্রুত বর্ধনশীল ও নবায়নযোগ্য। BBF Digital-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল উদাহরণস্বরূপ বর্জ্য কাগজ, পাল্প ও রাসায়নিক পদার্থ- এখনও আমদানিনির্ভর। ডলার সংকটে এই আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতে পারে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কাগজশিল্পের সম্ভাবনা এখনও নিভে যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার এখন ৭৪ শতাংশ এর বেশি, যা ভবিষ্যতে কাগজশিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়লে পাঠ্যবই, নোটবুক ও শিক্ষা উপকরণের চাহিদা বাড়বে- যা দেশীয় কাগজশিল্পের জন্য একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য বাজার। China Research and Intelligence (CRI)-এর পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের কাগজ বাজারের আকার ২০২৪ সালে ৪৮৫.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সালে ৭৮৫.৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বার্ষিক ৫.৫% চক্রবৃদ্ধি হারে। সেইসাথে, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের সামগ্রিক চাহিদা বাড়তেই থাকবে। সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে টিস্যু ও হাইজিন পণ্যের বাজারে। The Pulp and Paper Times-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে টিস্যু পেপারের বাজার মাত্র এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে- নগরায়ণ, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে। 6Wresearch জানাচ্ছে, ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধু ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য টিস্যু পেপারের চাহিদা আরও বাড়বে এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এই বাজারের পরিসর আরও সম্প্রসারিত করছে। প্যাকেজিং পেপারেও রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম ভরসা জানান, লেখার ও ছাপার কাগজে দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট। তবে তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের প্যাকেজিং কাগজ এখনও আমদানি হচ্ছে জাপান, কোরিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে। এটি সরাসরি আমদানি প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি করছে দেশীয় শিল্পের জন্য।
পরিবেশবান্ধু পণ্যের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। প্লাস্টিক কাপ ও পলিব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার এখন পর্যন্ত কাগজ পণ্যের চাহিদাকে সীমিত রেখেছে।
লাবনী আক্তার শিমলা
গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়