প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ জুলাই, ২০২৬
প্রযুক্তি আজ মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একসময় যে পৃথিবীতে তথ্যের আদান-প্রদান, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ সেখানে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সহজ, গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি বড় বাস্তবতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বিশ্বের সব মানুষ সমানভাবে প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে না। প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও ব্যবহারের এই অসমতাই আজকের ডিজিটাল বিভাজন, যা বৈশ্বিক বৈষম্যকে আরও গভীর ও স্থায়ী করে তুলছে।
ডিজিটাল বিভাজন বলতে কেবল ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের অভাবকে বোঝায় না; বরং এটি প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, ব্যবহারিক দক্ষতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং প্রযুক্তি থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা অর্জনের সক্ষমতার পার্থক্যকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে বৈশ্বিক বৈষম্য বলতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং উন্নয়নের সুযোগের অসম বণ্টনকে বোঝায়। এই দুই বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অর্থনীতি, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের অনেক মানুষ এখনও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে একই পৃথিবীতে বসবাস করেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
ডিজিটাল বিভাজনের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে স্মার্টফোন, কম্পিউটার কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের ব্যয় বহন করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। আবার অনেক মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগও পান না। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইন্টারনেটের বিপুল পরিমাণ তথ্য এখনও ইংরেজিনির্ভর হওয়ায় মাতৃভাষাভাষী অনেক মানুষ জ্ঞান ও তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে অনেক দেশে নারীরা এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ডিজিটাল বিভাজনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় শিক্ষাক্ষেত্রে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে, প্রযুক্তির সুবিধাবঞ্চিত লাখো শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। অনেকেই ডিভাইসের অভাবে কিংবা দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে দীর্ঘ সময় শিক্ষার বাইরে ছিল। ফলে শিক্ষায় যে বৈষম্য আগে থেকেই ছিল, তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একইভাবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল দক্ষতা এখন একটি অপরিহার্য যোগ্যতা। যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ, তারা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন; অন্যদিকে দক্ষতার অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ আধুনিক কর্মক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়ছেন।
স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও ডিজিটাল বিভাজনের নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। টেলিমেডিসিন, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-গভর্নেন্স কিংবা অনলাইন সেবার সুবিধা তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষের হাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও সক্ষমতা থাকে। অন্যথায় উন্নয়নের সুফল শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে প্রযুক্তি বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে অনেক সময় নতুন ধরনের বৈষম্যের জন্ম দেয়। বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি সেবা ডিজিটাল হয়েছে, মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার ঘটেছে, অনলাইন শিক্ষা ও ই-কমার্সের প্রসার ঘটেছে এবং তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তিগত সুযোগের পার্থক্য, উচ্চগতির ইন্টারনেটের সীমিত প্রাপ্যতা, ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি, নিম্নআয়ের মানুষের প্রযুক্তিপণ্য ক্রয়ের অক্ষমতা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রযুক্তি ব্যবহারে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এখনও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা।
ডিজিটাল বিভাজন দূর করা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। এজন্য সবার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ, স্থানীয় ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, নারীদের প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিপণ্য সহজলভ্য করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখবে, যখন এর সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে।
অন্যথায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক বৈষম্যকে আরও বিস্তৃত করবে এবং উন্নয়নের ব্যবধান আরও বাড়াবে। তাই ডিজিটাল বিভাজন কমানো আজ কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বিশ্ব গঠনের অপরিহার্য শর্ত। প্রযুক্তি যেন বৈষম্যের নয়, বরং সমতার সেতুবন্ধন হয়ে ওঠে- এই লক্ষ্যেই আমাদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
মো. মুজাহিদ হোসেন রুমেল
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়