ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস : অংশীদারত্বের শক্তিতে টেকসই উন্নয়নের পথ

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস : অংশীদারত্বের শক্তিতে টেকসই উন্নয়নের পথ

প্রতিবছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো সমবায় ব্যবস্থার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক অবদানকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির এই সময়ে সমবায় এমন একটি ধারণা, যেখানে ব্যক্তি নয়, মানুষের সম্মিলিত শক্তিই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। সমবায় শুধু একটি ব্যবসায়িক কাঠামো নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায্যতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি জীবনদর্শন।

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং খাদ্যনিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে সমবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। ব্যক্তি একা যে শক্তি অর্জন করতে পারে না, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব- সমবায়ের মূল দর্শন এখানেই। ক্ষুদ্র কৃষক, জেলে, তাঁতি, নারী উদ্যোক্তা কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য একত্রিত করে উৎপাদন, বিপণন, সঞ্চয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় অংশ নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।

সমবায়ের ইতিহাস দীর্ঘ। শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়াস থেকেই আধুনিক সমবায় আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। পরবর্তীকালে এই ধারণা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয় এবং কৃষি, দুগ্ধশিল্প, ব্যাংকিং, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভোক্তা সেবা ও ক্ষুদ্র শিল্পসহ নানা ক্ষেত্রে সমবায়ের সফল প্রয়োগ দেখা যায়। আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।

সমবায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এর গণতান্ত্রিক কাঠামো। এখানে মূলধনের পরিমাণ নয়, সদস্য হিসেবে প্রত্যেকের মতামতের মূল্য সমান। ‘এক সদস্য, এক ভোট’ নীতি সমবায়কে অন্য অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের থেকে আলাদা করে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়। এই কাঠামো মানুষের মধ্যে মালিকানাবোধ সৃষ্টি করে, যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

বর্তমান বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নয়নের সুফল যদি শুধু একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বৈষম্য আরও বাড়বে। সমবায় সেই বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর উপায়। কারণ এটি মুনাফার পাশাপাশি সদস্যদের কল্যাণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশকে গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমবায় আত্মনির্ভরতার বাস্তব পথ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমবায়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে বাজারজাত করার ক্ষেত্রে সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরিতেও সমবায়ের সম্ভাবনা ব্যাপক। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সমবায় গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও সমবায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী নিজস্ব পুঁজি বা বাজারে প্রবেশের সুযোগ না পেলেও সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন, সঞ্চয় এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন। এতে শুধু তাদের আয় বাড়ে না, পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। নারীকেন্দ্রিক সমবায়গুলো সামাজিক পরিবর্তনেরও কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সমবায় একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, ডিজিটাল বিপণন, ই-কমার্স, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক সমবায় গড়ে তুলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এতে চাকরির ওপর একমাত্র নির্ভরশীলতা কমবে এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায়ও সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে টেকসই কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়, আর সেই অংশগ্রহণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে সমবায়।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সমবায় প্রতিষ্ঠান দুর্বল নেতৃত্ব, অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সদস্যদের অনাগ্রহের কারণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কোথাও কোথাও সমবায়ের মূল দর্শন থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে, ফলে মানুষের আস্থাও কমেছে। এসব সমস্যা সমাধানে কঠোর জবাবদিহি, নিয়মিত নিরীক্ষা, দক্ষ নেতৃত্ব, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং সদস্যদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে সমবায় ব্যবস্থাকেও সময়োপযোগী হতে হবে। সদস্য নিবন্ধন, হিসাবরক্ষণ, অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল বিপণন এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সমবায় আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে আধুনিক ব্যবসায়িক ধারণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সমবায়ের সাফল্য শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে না। সদস্যদের সততা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দায়িত্ববোধই একটি সমবায় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি। আইন ও নীতিমালা যতই উন্নত হোক, সদস্যরা যদি নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে না দেখেন, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন। আবার সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত সহযোগিতা থাকলে সমবায়ের বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পালন নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়নের সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি হলো মানুষের সম্মিলিত শক্তি। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায্যতা এবং অংশীদারত্বের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, সমাজ তত বেশি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সমবায়ের বিকল্প খুব বেশি নেই।

আজকের বিশ্বে যেখানে বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে সমবায় নতুন করে আশার বার্তা বহন করছে। মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পথ সুগম করতে। আন্তর্জাতিক সমবায় দিবসের চেতনা আমাদের সেই বিশ্বাসই পুনরুজ্জীবিত করে- একসঙ্গে এগোলে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত