ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পরিবেশ রক্ষায় সার্কুলার ইকোনমি : টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিশা

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ
পরিবেশ রক্ষায় সার্কুলার ইকোনমি : টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিশা

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন উন্নয়নের প্রতিটি ধাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবেশের ওপর চাপ। নতুন সড়ক, উঁচু ভবন, শিল্পকারখানা, শপিংমল কিংবা আধুনিক জীবনযাত্রা আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে হাজার হাজার টন বর্জ্য। প্লাস্টিক নদীতে ভাসছে, ইলেকট্রনিক বর্জ্য মাটিতে বিষ ছড়াচ্ছে, খাদ্যের অপচয় বাড়ছে, আর শহরগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিশাল বর্জ্যরে স্তূপে। আমরা এখনও উন্নয়নকে উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করি, কিন্তু খুব কমই ভাবি এই উন্নয়নের মূল্য কতটা পরিবেশকে দিতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে দিন দিন গুরুত্ব পাচ্ছে Circular Economy (সার্কুলার ইকোনমি)। এটি এমন একটি আধুনিক অর্থনৈতিক দর্শন যা আমাদের শেখায় যে প্রকৃতিতে কোনো কিছুই আসলে অপ্রয়োজনীয় নয়। একটি পণ্যের ব্যবহারিক জীবন শেষ হওয়া মানেই তার মূল্য ফুরিয়ে যাওয়া নয়, বরং সেখান থেকেই শুরু হতে পারে নতুন কোনো পণ্যের পথচলা।

অর্থাৎ, পুরোনো যুগের সেই প্রচলিত ধারণা ‘নাও, ব্যবহার করো এবং ফেলে দাও’ এর পরিবর্তে সার্কুলার ইকোনমি আমাদের নতুন এক মন্ত্র শেখায়:? ‘নাও, ব্যবহার কর, পুনর্ব্যবহার কর এবং আবার নতুন মূল্য সৃষ্টি কর।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধারণা শুধু পরিবেশ রক্ষার কৌশল নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি। কারণ পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ভোগের ধরন এখনও অনেকাংশে একমুখী অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। আমরা কাঁচামাল সংগ্রহ করি, পণ্য তৈরি করি, ব্যবহার করি এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোকে বর্জ্যে পরিণত করি। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে, দূষণ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ অপচয়ের মধ্যে হারিয়ে যায়।

বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট। বাজারের ব্যাগ থেকে শুরু করে পানীয় বোতল, খাদ্যের মোড়ক কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের অসংখ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার শেষে নদী, খাল, কৃষিজমি কিংবা ড্রেনে গিয়ে জমা হচ্ছে।

বর্ষাকালে এই প্লাস্টিক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলে। অথচ এই প্লাস্টিকের বড় অংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য। সঠিক সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এগুলো আবারও অর্থনীতির অংশ হতে পারে।

একই চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাপড়ের উচ্ছিষ্ট তৈরি হয়। এই কাপড় পুনর্ব্যবহার করে নতুন সুতা, পোশাক কিংবা শিল্পপণ্য উৎপাদন করা গেলে যেমন কাঁচামালের ব্যবহার কমবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ সার্কুলার ইকোনমি শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।

ইলেকট্রনিক বর্জ্যও বাংলাদেশের জন্য দ্রুত বেড়ে ওঠা একটি নীরব সংকট।

প্রতিবছর অসংখ্য মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র অচল হয়ে যায়। এসব যন্ত্রে থাকা সীসা, পারদ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই যন্ত্রগুলো থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ফলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে নতুন সম্পদও সৃষ্টি হবে।

খাদ্য অপচয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা কম নয়। প্রতিদিন বাজার, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবার থেকে বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য তৈরি হয়। এগুলোকে যদি কম্পোস্ট সার বা বায়োগ্যাসে রূপান্তর করা যায়, তবে বর্জ্য যেমন কমবে, তেমনি কৃষি ও জ্বালানি খাতও উপকৃত হবে। অর্থাৎ যে বর্জ্য আজ শহরের দুর্গন্ধের কারণ, সেটিই আগামী দিনের সম্পদে পরিণত হতে পারে।

তবে সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়ন শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি মানসিকতারও পরিবর্তন। আমরা এখনও নতুন পণ্য কেনাকে আধুনিকতা মনে করি, কিন্তু পুরোনো পণ্য মেরামত বা পুনর্ব্যবহারকে গুরুত্ব দিই না। অনেক ক্ষেত্রে উৎস পর্যায়ে বর্জ্য আলাদা করার সংস্কৃতি নেই, পুনর্ব্যবহার শিল্প পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও সীমিত। ফলে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবে পূর্ণতা পেতে পারে না।

এই পরিবর্তন আনতে সরকারকে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে এমন পণ্য তৈরি করতে হবে, যা দীর্ঘস্থায়ী, সহজে মেরামতযোগ্য এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে হবে, আর নাগরিকদেরও একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের পরিবর্তে টেকসই বিকল্প বেছে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

সার্কুলার ইকোনমি আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি কখনও অপচয় করে না। একটি গাছের ঝরে পড়া পাতা যেমন মাটির উর্বরতা বাড়ায়, তেমনি মানুষের তৈরি প্রতিটি বর্জ্যও সঠিক ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ আরও বেশি উৎপাদন নয়; বরং কম অপচয়, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়, তবে সার্কুলার ইকোনমিকে শুধু পরিবেশ নীতির অংশ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ সেই হবে, যে দেশ বর্জ্য কমাতে পারবে, সম্পদের মূল্য বুঝবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, সহাবস্থানের পথ বেছে নেবে।

ইব্রাহীম ইবনে আজিজ

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত