প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৪ জুলাই, ২০২৬
বাংলাদেশ একসময় সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, নদী-নালা, খাল-বিল এবং উর্বর কৃষিজমির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে আজ পরিবেশ নানা সংকটের মুখোমুখি। এই সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ। প্রতিদিন দেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে না। ফলে এসব বর্জ্য খাল-বিল, নদী, ড্রেন, কৃষিজমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করছে। পলিথিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি পরিচিত উপকরণ। বাজারের ব্যাগ, খাদ্যপণ্যের মোড়ক, প্যাকেটজাত দ্রব্য, বিভিন্ন শিল্পপণ্যের আবরণ- সবখানেই পলিথিনের ব্যবহার রয়েছে। এর জনপ্রিয়তার কারণ হলো এটি সস্তা, হালকা, সহজে বহনযোগ্য এবং জলরোধী। কিন্তু যে বৈশিষ্ট্যগুলো একে মানুষের কাছে সুবিধাজনক করে তুলেছে, সেই বৈশিষ্ট্যগুলোই পরিবেশের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলিথিন সহজে পচে না। মাটির নিচে এটি শত শত বছর পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়, পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং কৃষিজমির উর্বরতা কমে যায়। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ২০০২ সালে পাতলা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। সে সময় এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বিভিন্ন উপায়ে অব্যাহত রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো বিকল্প পণ্যের সীমিত প্রাপ্যতা, বাজারে সস্তা পলিথিনের সহজলভ্যতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। ফলে দুই দশকেরও বেশি সময় পরও পলিথিন দূষণ দেশের অন্যতম পরিবেশগত সমস্যার মধ্যে রয়ে গেছে।
পলিথিন দূষণের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় নগর এলাকায়। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কিংবা অন্যান্য শহরে বৃষ্টির সময় সামান্য বৃষ্টিপাতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর অন্যতম কারণ ড্রেন ও নর্দমায় জমে থাকা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং শহরের স্বাভাবিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত করে। ফলে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়ে, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতি বছর জলাবদ্ধতার কারণে যে ক্ষতি হয়, তার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী অপরিকল্পিত প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পলিথিনের ক্ষতি শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয় এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি করে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবুও এটি যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক একটি বিষয়, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নদী ও জলাশয়ের ক্ষেত্রেও পলিথিন একটি বড় হুমকি। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কিন্তু নদীতে ফেলা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। মাছ, কচ্ছপ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী অনেক সময় খাদ্য ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। নদীতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য পানির গুণগত মানও নষ্ট করে।
মো. রেজাউল করিম রনি
সাবেক শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট