প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ জুলাই, ২০২৬
বিশ্ব আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের মুখোমুখি। একসময় খাদ্যসংকট বলতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক মন্দাকে বোঝানো হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে মানবসভ্যতার সামনে নতুন এক বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। এটি আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশও এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনুভব করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও আকস্মিক বন্যা কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। কৃষকরা আর আগের মতো নির্দিষ্ট মৌসুম ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে, ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে শক্তিশালী এল নিনো ফিরে আসতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এটি গঠনের সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এমনটি ঘটলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন, যা বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে। এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় খরা ও তাপপ্রবাহ, দক্ষিণ আমেরিকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যসংকট এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার এল নিনোর প্রভাব অতীতের তুলনায় আরও তীব্র হতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যা কৃষি, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। অথচ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যা দেশের কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে খরা এবং মধ্যাঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গম, ধান ও ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। অথচ পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ বিশ্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
খাদ্যসংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্যস্ফীতি। উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহও কমে যায়, যার ফলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পুষ্টিকর খাদ্যের পরিবর্তে কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নয়; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতও এর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করছে। নদী, খাল ও জলাশয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং নতুন নতুন রোগের বিস্তারে গবাদিপশু পালনও কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বের বহু দেশ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি। সুদান, গাজা, সোমালিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান ও ইয়েমেনে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মতো দেশেও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিপুল জনগোষ্ঠী খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এই সংকট অনিবার্য নয়। সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবন, আধুনিক ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত সেচব্যবস্থা, কৃষকদের সহজ ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণে আরও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সংকট, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের মাধ্যমে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্য শুধু মানুষের মৌলিক চাহিদাই নয়; এটি একটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তি। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য খাদ্যসংকটকে ভবিষ্যতের আশঙ্কা হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। এটি ইতোমধ্যেই বিশ্বের বহু দেশে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আজকের দূরদর্শী পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং সমন্বিত উদ্যোগই আগামী প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সহনশীল করে তোলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মোছা. মায়া আক্তার
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়