প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৭ জুলাই, ২০২৬
মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হলেই রাজধানীবাসীর দুর্ভোগের সীমা থাকে না। গত রোববার খবরে প্রকাশ, ঢাকার অন্তত ১০৩টি স্পট বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৩৮টি স্পট রয়েছে। এসব জায়গার সড়ক, ফুটপাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে থাকায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বলা বাহুল্য, প্রতিবেদনে যে বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু নগরবাসীর সীমাহীন দুর্ভোগের গল্প নয়; বরং এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতার অভাবেরই এক জীবন্ত দলিল। দেশের দুই ধনী ও প্রভাবশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান-ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নাকে ডগাতেই বছরের পর বছর এই বর্ষাকালীন নরকযন্ত্রণা চলছে। কী কারণে এই পানি জমছে এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তা দুই সিটির প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সাধারণ নগরবাসী সবারই জানা। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সমাধানের সব দাওয়াই জানা থাকা সত্ত্বেও কেবল সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, আন্তরিকতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে রাজধানী ঢাকার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কোনো আশু সমাধান মিলছে না।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের শেষদিকে ঢাকা ওয়াসা থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পুরো দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু গত ৫ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকা ও দক্ষ জনবলের অভাবে জোড়াতালি দিয়েই এ বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। এছাড়া একদিকে যেমন ঢাকার পার্শ্ববর্তী জলাশয় ও পানি ধারণের জায়গাগুলো নির্বিচারে ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে খালগুলোকে একসময় বক্স কালভার্ট করে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে দুই সিটির চরম অদক্ষতা এবং অপর্যাপ্ত আউটলেট ও পাম্পিং স্টেশন।
আমরা মনে করি, জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে ঢাকাবাসীকে চিরতরে মুক্তি দিতে হলে নীতিনির্ধারকদের এখনই একটি সমন্বিত, সংবেদনশীল ও টেকসই রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নামতে হবে। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ঝেড়ে অনতিবিলম্বে দুই সিটি করপোরেশনে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ স্বতন্ত্র ড্রেনেজ বিভাগ এবং দক্ষ কারিগরি জনবল কাঠামো অনুমোদন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬-কে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে দ্রুত যাচাই-বাছাই করে এর শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। নগরীতে প্রয়োজনমাফিক নতুন পাম্পিং স্টেশনও দ্রুত স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নদনদীর নাব্যতা ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত খননকাজ চালাতে হবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে নগরবাসীর ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত সিটি কর্পোরেশনদ্বয় অতীতের মতো ঠুনকো অজুহাত বা দায় এড়ানোর সংস্কৃতি দেখাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। পয়ঃবর্জ্য আর বৃষ্টির পানির লাইন আলাদা করা এবং অবৈধভাবে ভরাট হওয়া জলাশয়গুলো উদ্ধারে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও বিকল্প নেই। বিগত সরকারের আমলের অপরিকল্পিত মেগা-প্রজেক্টের কলঙ্ক মুছে ফেলে দুই সিটি কর্পোরেশন দ্রুততম সময়ে ঢাকাবাসীকে একটি আধুনিক, সচল এবং জলজটমুক্ত স্বপ্নের রাজধানী উপহার দেবে- এটাই প্রত্যাশা।