প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩০ জুলাই, ২০২৬
বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কুলিং ভিসা কিংবা ওয়ার্ক পারমিটের স্বপ্ন দেখিয়ে দেশের শত শত তরুণ-তরুণী ও অভিভাবককে নিঃস্ব করার যে ভয়াবহ প্রতারণা ও জালিয়াতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগের।
রাজধানীর একটি কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিদেশে পড়তে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই পুঁজি করে প্রতিষ্ঠানটি। এর ওপর আস্থা রেখে প্রতারিত হয়ে অনেকেরই শিক্ষাজীবন থমকে গেছে। অনেক পরিবার ঋণের ভারে জর্জরিত। কারও কারও ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি পরিকল্পিতভাবে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, ভুয়া অফার লেটার এবং নিশ্চিত ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আদায় করে।
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মাল্টা, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ফ্যামিলি ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা প্রক্রিয়া পরিচালনা করত প্রতিষ্ঠানটি। এ বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে চলতি মাসের প্রথম দিকে তারা রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান, বনানীসহ সব অফিস বন্ধ করে লাপাত্তা হয়েছে। ছয় শতাধিক তরুণ-তরুণী ও অভিভাবক এ চক্রের প্রতারণার শিকার হন। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যে, একবার নিবন্ধনের পর বিভিন্ন অজুহাতে বারবার টাকা নেওয়া হতো।
তবে এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আটকও করা হয়েছে একাধিক জনকে। রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় প্রতারক চক্রগুলো কীভাবে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বছরের পর বছর এমন অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল, এটাই বড় প্রশ্ন। প্রতারণার শিকার এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের দায় এখন কে নেবে? যেসব পরিবার তাদের সহায়-সম্বল হারিয়ে পথে বসার জো হয়েছে, তাদেরইবা কী হবে? সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়, এ চক্রগুলোর সঙ্গে মানি লন্ডারিং বা বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও উঠেছে।
আটক হওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে এ চক্রের মূল হোতার পারিবারিক যোগাযোগ থাকার তথ্যটিও গভীরভাবে ততদন্তের দাবি রাখে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ভুক্তভোগীদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ মূল হোতাসহ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রকাশ ও আসামিদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনাটি মূলত ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা তীব্র হতাশা এবং অসহায়ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
আমরা মনে করি, শত শত তরুণ-তরুণীর সঙ্গে সংঘটিত এ ঘটনা সাধারণ জালিয়াতি নয়। এটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। মূলত ভুক্তভোগীদের সরলতা ও আবেগকে পুঁজি করেই প্রতারকচক্র এসব করেছে। এখানে ভুক্তভোগীদের অসচেতনতাকে হয়তো দায়ী করা যায়। কিন্তু সে দায় কতটা? সবার পক্ষে প্রতারণা যাচাই করা তো সম্ভব নয়, আবার এটা তাদের দায়িত্বও নয়। ফলে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। কেননা রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জানমাল হেফাজতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোথায় কোন প্রতিষ্ঠান কী ব্যবসা করছে, কী সেবা দিচ্ছে, তা প্রশাসনের নজরে থাকাটাই ছিল বাস্তবসম্মত।
বিলম্বে হলেও প্রশাসনের তৎপরতা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এটাই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। দরকার উচ্চশিক্ষার নামে এ ধরনের প্রতারক চক্রের মূলোৎপাটন করা। আমাদের প্রত্যাশা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে তৎপর হবে। পাশাপাশি লোভনীয় ও চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দেওয়ার আগে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা আশা করি, ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত দেওয়াসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।