ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মাইক্রোপ্লাস্টিক : আমরা কি নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে

ড. মতিউর রহমান
মাইক্রোপ্লাস্টিক : আমরা কি নতুন জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে

প্লাস্টিক একসময় আধুনিকতার প্রতীক ছিল। হালকা, সস্তা, টেকসই এবং বহুমুখী হওয়ায় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিল্প, কৃষি, চিকিৎসা, খাদ্য সংরক্ষণ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু প্লাস্টিকের যে বৈশিষ্ট্য একে অর্থনৈতিকভাবে এত লাভজনক করেছে, সেই দীর্ঘস্থায়িত্বই আজ পৃথিবীর জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক প্রকৃতিতে সহজে পচে যায় না; বরং সূর্যের আলো, তাপ, ঘর্ষণ, ঢেউ এবং পরিবেশগত ক্ষয়ের ফলে ক্রমে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। এ ক্ষুদ্র কণাগুলো খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং উন্নয়ন-শাসনের একটি ক্রমবর্ধমান সংকট।

পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে সাধারণভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, এসব কণা কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষুদ্র আকারে তৈরি হয়, আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় প্লাস্টিকের বোতল, ব্যাগ, মোড়ক, জাল, পাত্র ও অন্যান্য পণ্য ভেঙে তৈরি হয়। ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড থম্পসন ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার মাধ্যমে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ ধারণাটিকে আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের আলোচনায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। দুই দশকের মধ্যে সেই গবেষণার বিষয় আজ বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডির ‘গ্লোবাল প্লাস্টিকস আউটলুক’ অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে প্লাস্টিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৩ কোটি ৪০ লাখ টন; ২০১৯ সালে তা বেড়ে ৪৬ কোটি টনে পৌঁছায়। একই সময়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ১৫ কোটি ৬০ লাখ টন থেকে বেড়ে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ টনে উন্নীত হয়। ওইসিডির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে উৎপন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যরে মাত্র ৯ শতাংশ কার্যকরভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ প্লাস্টিক উৎপাদনের বিস্তার যত দ্রুত হয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তত দ্রুত উন্নত হয়নি।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি সতর্ক করেছে যে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৬০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হতে পারে। এই বাস্তবতা দেখায় যে সমস্যাটি শুধু ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহারের নয়; প্লাস্টিকের উৎপাদন, ব্যবহার, নকশা এবং পুরো জীবনচক্র পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

আজ মাইক্রোপ্লাস্টিক সমুদ্র, নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষিজমি, বৃষ্টির পানি এবং বায়ুমণ্ডলে পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় আর্কটিকের বরফ ও দূরবর্তী অঞ্চলেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ভেসে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে পারে। ফলে এটি কোনো একটি দেশ বা শহরের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক পরিবেশব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়া এক ধরনের অদৃশ্য দূষণ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ দূষণ এখন খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় মাছ, সামুদ্রিক খাদ্য, লবণ, মধু, চিনি, পানীয় জল এবং নানা খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি বাতাসের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা, হৃদ্রক্তনালি এবং অন্যান্য মানব টিস্যুতে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রাণী ও মানবকোষে পরিচালিত গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে প্রদাহ, প্রজনন সমস্যা, হৃদ্রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাব্য সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এসব সম্পর্কের কারণ-ফল নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য ক্ষতি শুধু কণার ভৌত উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্লাস্টিকে বিভিন্ন রাসায়নিক সংযোজক থাকতে পারে। আবার পরিবেশে থাকা ভারী ধাতু, কীটনাশক ও অন্যান্য দূষক কণার পৃষ্ঠে যুক্ত হতে পারে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক কখনও দূষক বহনের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে। গবেষণায় প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, কোষীয় ক্ষতি এবং অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক সতর্কতা জরুরি- উপস্থিতি মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে রোগের প্রমাণ নয়, কিন্তু ব্যাপক উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য জৈবিক ক্ষতি ঝুঁকি মূল্যায়নের যথেষ্ট কারণ।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থায় প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপক। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপে প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নদী-খাল-জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশের কারণে পরিবেশ থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশে ভোজ্য সয়াবিন তেল নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেশে বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ডেড ও নন-ব্র্যান্ডেড সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাটিকে বাংলাদেশের সয়াবিন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তকরণবিষয়ক প্রথম প্রকাশিত গবেষণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের ফলাফলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায় এবং নন-ব্র্যান্ডেড তেলে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। নমুনায় তন্তুজাতীয় কণার আধিক্য দেখা গেছে; ছয় ধরনের পলিমার শনাক্ত হয়েছে এবং ভোজ্যতেলে নাইলন ও পলিইউরেথেনের উপস্থিতিও রিপোর্ট করা হয়েছে।

এ ফলাফলকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। সয়াবিন তেল বাংলাদেশের বহু পরিবারের প্রতিদিনের রান্নার অপরিহার্য উপাদান। তাই এতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানে সম্ভাব্য এককালীন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য-এক্সপোজারের প্রশ্ন। তবে গবেষণার ফল থেকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যরোগের সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। প্রয়োজন বৃহত্তর নমুনা, বিভিন্ন অঞ্চল ও ব্র্যান্ডভিত্তিক পরীক্ষা এবং খাদ্যগ্রহণের পর শরীরে প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ।

দুধের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গবেষণা উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে। ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস’-এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া ১৯টি গুঁড়ো দুধ এবং ৬টি তরল দুধের ব্র্যান্ড পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাটিতে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত, এর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।

দুধ শিশু, কিশোর, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। তাই এ ধরনের দূষণকে সাধারণ খাদ্যমানের সমস্যা হিসেবে দেখলে যথেষ্ট হবে না। উৎপাদনযন্ত্র, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, সংরক্ষণব্যবস্থা, পরিবহন কিংবা কারখানার বাতাসে থাকা সিনথেটিক তন্তু- বিভিন্ন উৎস থেকে দূষণ ঘটতে পারে। কোন পর্যায়ে কতটা দূষণ হচ্ছে, তা নির্ণয়ের জন্য ‘ফার্ম থেকে ভোক্তা’ পর্যন্ত পুরো সরবরাহশৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ জরুরি।

জুলাই ২০২৬-এ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ইএসডিওর প্রকাশিত গবেষণা বাংলাদেশের ভোক্তাপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি দেশীয় ও আমদানিকৃত ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে ২৬টি নমুনায়, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

টুথপেস্ট খাদ্য নয়, কিন্তু এটি প্রতিদিন সরাসরি মুখগহ্বরে ব্যবহৃত হয়। দাঁত ব্রাশ করার সময় সামান্য অংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। ফলে এই গবেষণা শুধু ভোক্তা-পণ্যের গুণগত মান নয়, মানুষের দৈনন্দিন এক্সপোজারের প্রশ্নও সামনে এনেছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া মানেই সব ব্র্যান্ড ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর প্লাস্টিক মেশাচ্ছে- এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কণাগুলোর উৎস, ধরন, উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় প্রবেশের পথ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তবু সয়াবিন তেল, দুধ ও টুথপেস্ট- এই তিনটি গবেষণাকে একসঙ্গে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু নদী বা সমুদ্রের সমস্যা নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহার্য ও ভোগ্যপণ্যের মধ্যে প্রবেশ করছে। রান্নাঘর থেকে খাবারের টেবিল, শিশুর খাদ্য থেকে ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য- বিভিন্ন পথ দিয়ে মানুষের সংস্পর্শ ঘটছে। এ কারণেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন গবেষণার ফল হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।

তবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করাও সমাধান নয়। এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বলে সেটি খাওয়ার ফলে নিশ্চিতভাবে কোন রোগ হবে- এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মানবভিত্তিক প্রমাণ নেই। কিন্তু অনিশ্চয়তা নীতিগত নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। জনস্বাস্থ্যে সতর্কতামূলক নীতির মূল কথা হলো, সম্ভাব্য ক্ষতির প্রমাণ শক্তিশালী হলে এবং মানুষের এক্সপোজার ব্যাপক হলে পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তার অপেক্ষায় বসে না থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।

এখানে রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস্টিক সস্তা হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমায়, পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহন সহজ করে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ায়। কিন্তু প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার, দূষিত পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যক্ষতির ব্যয় বহন করে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব’- যেখানে লাভের বড় অংশ ব্যক্তিখাতে থাকে, আর ক্ষতির বোঝা সামাজিকভাবে বণ্টিত হয়।

বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিত গবেষণা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ভোজ্যতেল, দুধ, শিশুখাদ্য, বোতলজাত পানি, মাছ, লবণ, চাল এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে নিয়মিত পরীক্ষা চালানো দরকার। একই সঙ্গে পরীক্ষাগারে অভিন্ন পদ্ধতি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বিভিন্ন গবেষণার ফল তুলনাযোগ্য হয়।

খাদ্য কারখানায় প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও উৎপাদনপরিবেশের সম্ভাব্য দূষণ উৎস চিহ্নিত করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শুধু উৎপাদনের মান নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, একবার ব্যবহারযোগ্য অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কমানো এবং নিরাপদ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্প সম্প্রসারণও জরুরি।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: প্লাস্টিক ফেলে দিলেই তা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় না। তা ভেঙে আরও ছোট হয়, পরিবেশে ছড়ায়, খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে পৌঁছাতে পারে। যে দূষণ চোখে দেখা যায় না, তার ঝুঁকিও যে কম নয়- বাংলাদেশের সয়াবিন তেল, দুধ ও টুথপেস্ট নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে।

এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কতা; অস্বীকার নয়, স্বচ্ছ গবেষণা; এবং বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত নীতি। মাইক্রোপ্লাস্টিককে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ক্রমেই খাদ্যনিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের এক অদৃশ্য সীমান্তে পরিণত হচ্ছে। আজ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনে এই অদৃশ্য প্লাস্টিকের মূল্য দিতে হতে পারে মানুষের স্বাস্থ্য, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা দিয়ে।

ড. মতিউর রহমান

লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত