ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে

কাজী বনফুল
তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে

আমাদের জীবনকে সার্বিক দিক দিয়ে পরিচালিত করে সমাজব্যবস্থা।

সমাজ নির্ধারিত দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান বিভিন্ন রীতিনীতির বাক্সে মানুষ সেই আদিকাল থেকেই বন্দি। সাপুড়ে তার ঝাঁপিতে রাখা সাপকে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা তার একটি ব্যবসায়িক ও চাতরিক কৌশল, যার মাধ্যমে সাপুড়ে সাপের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে তাবিজ-কবজ ব্যবসার প্রসার ঘটায়। ঠিক তেমনি আমাদের সমাজব্যবস্থা আমাদের সবাইকে এক অদৃশ্য সম্মিলিত নাগপাশের বন্ধনে বেঁধে রেখেছে। কেউ চাইলেই সেই নাগপাশকে অতিক্রম করতে পারে না। কারণ এটা এমন এক মন্ত্রব্যবস্থা, যা জোরপূর্বক নয় ঠিকই, কিন্তু অদৃশ্য ভয়মিশ্রিত ঝুপড়ির বদ্ধ কারাগার। যেখানে সাপের সব নিয়ন্ত্রণ প্রায় সাপুড়ের হাতে। সে সাপুড়েটি হচ্ছে আমাদের অর্বাচীন সমাজব্যবস্থা। আমাদের এ সমাজব্যবস্থা এমন একটা অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে পড়াশোনা শেষ করা একটি ছেলে-মেয়েকে একটি নির্দিষ্ট চাকরি বা জীবনব্যবস্থার বাইরে জায়গা দিতে চায় না বা তাদের কোনো প্রকার স্থান নেই, এমন একটা অদৃশ্য জাল সমাজে সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করা ছেলে বা মেয়েকে সমাজে স্থান পেতে হলে অবশ্যই তাকে বা তাদের ইচ্ছের সবটুকু ষোলোকলা পূর্ণ করেই স্থান নিতে হবে। সেই ষোলোকলা আসলে কী? সেই ষোলোকলা হচ্ছে তাদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো অযাচিত সিদ্ধান্তের সমাহার। সমাজ যেভাবে চাইবে, সেভাবেই আপনাকে চলতে হবে, প্রস্তুত হতে হবে। চাইলেই আপনি নতুনত্বের পথে হাঁটতে পারবেন না। চাইলেই যে কেউ সে ব্যবস্থার বাইরে যেতে পারবে না। তাহলে সমাজ তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে ভাগাড়ে। জীবন আপনার; কিন্তু সে জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কোনো মানুষের ঝাঁক। সেদিন ছোট একটা হালিমের দোকানে বসে হালিম খাচ্ছি। যে ছেলেটা হালিম বিক্রি করছে, তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখছি। বয়স কত একুশ-বাইশ হবে। দেখতে বেশ পরিপাটি। আমি বললাম, কতদিন যাবৎ হালিমের দোকান করছেন? ছেলেটি বলল, এই দুই বছর। সে ইচ্ছে করে বলল, পড়াশোনা শেষ করেছি অনেক জায়গায় চাকরির জন্য ঘুরেছি, কিন্তু কোথাও চাকরি হয়নি। দু-একটা যা হয়েছে, বেতন এত কম, যা দিয়ে নিজেরই হবে না, সংসার চালাব কীভাবে। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করব এবং এখন ব্যবসাটা করছি। বললাম কী রকম বিক্রি হয়? সে বলল, প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার টাকা বিক্রি করি। মাসে সব খরচ বাদ দিয়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাভ থাকে। আমি বললাম, তাহলে তো খুব ভালো। সে বলল, হ্যাঁ ভাই ভালো আছি। প্রথমে সবাই উল্টাপাল্টা অনেক কথা বলছে যে, পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত হালিমের দোকান দিবি! তাহলে পড়াশোনা করে কী লাভ হলো! আমার পরিবারকেও সমাজ অনেক কথা শুনিয়েছে, কিন্তু আমি ওসব কথা শুনিনি। কারণ, আমাকে তো কেউ দুই টাকা দিয়ে সাহায্য করে না। সমাজ তো আমি না খেয়ে থাকলে ভাত দেবে না। আমি চাকরি খুঁজেছি, পাইনি। যদি কোথাও দিতে চায়, বেতন ১৫ হাজার। অথচ আমি এই ছেলেটা রাখছি ওরে আমি মাসে ১৬ হাজার টাকা বেতন দেই। তেজি ছেলে। সমাজের সবকিছু উপেক্ষা করে সে এ ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। এখন দুজন লোকের সে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করেছে। দুজন ছেলে তার সঙ্গে কাজ করে। এমন অনেক অনেক সেক্টর রয়েছে, যেখানে তরুণরা স্ব-উদ্ভাবিত উদ্যোগে ব্যবসা বা উৎপাদন করলে অনেক নিগৃহীত চাকরির চেয়ে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভালো থাকবে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থা সে সুযোগটা তাদের দিতে চায় না। সমাজ তাদের ওই একই পথের পথিক হিসেবে দেখতে চায়। পড়াশোনা করেছ তো তোমাকে চাকরিই করতে হবে, না হলে তুমি সমাজে সম্মান পাবে না। তোমার স্থান এখানে নেই। সেদিন দেখলাম একটি পড়াশোনা শেষ করা ছেলে মুরগির খামার দিয়েছে। সে তার পরিবার নিয়ে বেশ ভালো আছে, কিন্তু সমাজ তাকে নানা কথা শোনাচ্ছে। সমাজ পড়াশোনা শেষ করে তার এই মুরগি লালন-পালনকে মেনে নিতে পারছে না। সমাজ তাকে বারবার টেনে ধরছে; কিন্তু সে সব কিছুকে তার মনের জোর দিয়ে মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে।

সমাজ যদি তরুণদের মুক্তচিন্তা ও স্ব-উদ্ভাবিত পন্থাকে সহযোগিতা না করে, তাহলে তরুণরা এগিয়ে যাবে কী করে? তরুণরা কীভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? আমরা আশা করব, সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে। তরুণরা স্বউদ্যোগে সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে।

লেখক : সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত