ঢাকা রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চাতক পাখি : প্রতীক্ষা, মিথ ও বাস্তবতার এক প্রতীক

হুমায়রাত হক প্রমি
চাতক পাখি : প্রতীক্ষা, মিথ ও বাস্তবতার এক প্রতীক

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ‘চাতক’ শুধু একটি পাখির নাম নয় বরং এটি এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতীক। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, বৃষ্টির জন্য অধীর অপেক্ষা- এই চিত্রটি আমাদের কবিতা, গান আর কথ্য ভাষায় গভীরভাবে গেঁথে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই চাতক কি শুধুই কল্পনার সৃষ্টি, নাকি বাস্তবেও এর অস্তিত্ব আছে?

বাস্তবতা হলো চাতক পাখি সত্যিই আছে। এর ইংরেজি নাম Pied Cuckoo, বৈজ্ঞানিক নাম Clamator jacobinus। কালো-সাদা রঙের এই পাখিটি দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর আচরণও মানুষের কৌতূহলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুদিন ধরে। এর চেহারায়ও একটা রাজকীয় চাপ রয়েছে। মাথায় শিংয়ের মতো মুকুট, লম্বা লেজ। লেজসহ দেখতে অনেকটা ময়না পাখির মতো। এই পাখি উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বসে থাকতে দেখা যায়। কখনও আবার জোড়ায় এরা ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে খাবার খায়। পোকামাকড়, পিঁপড়া, উইপোকা ইত্যাদি তার খাবার। এই পাখির আয়ু ২০ বছর। আর মৃত্যুর সময় পীঠ মাটিতে ঠেকিয়ে দুই পা উপরে তুলে এবং ঠোঁট হা করা অবস্থায় আকাশের দিকে তাকিয়ে মারা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি একটি পরিচিত পরিযায়ী পাখি, এবং বাংলাদেশেও গ্রীষ্মকালে এর দেখা মেলে। শীতকালে আফ্রিকায় চলে যায় আর শীত শেষে আবার ফিরে আসে।চাতক পাখি কয়েক ধরণের হয়। বাংলাদেশে ৪ প্রকার পাখিকে চাতক হিসেবে ডাকা হয়। তবে পাকরা পাপিয়া-ই চাতক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এটি একটি দুর্লভ পাখি। চাতক নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিশ্বাসটি হলো-এই পাখি নাকি শুধু বৃষ্টির পানি পান করে অন্য কোনো পানি স্পর্শ করে না। এই ধারণাটি এতটাই শক্তভাবে গড়ে উঠেছে যে, ‘চাতকের মতো অপেক্ষা’ এখন একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান এ বিশ্বাসকে সমর্থন করে না। অন্যান্য পাখির মতোই চাতকও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে পানি পান করে। অর্থাৎ, বৃষ্টির জন্য তার এই প্রতীক্ষা মূলত কাব্যিক কল্পনা-বাস্তবিক নয়। এ প্রতীক্ষার অনুভূতিটা সুন্দরভাবে ধরা পড়ে বাউল সাধক লালন ফকির-এর গানে- ‘চাতকও প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে আছে কালো শশী।’

এ এক লাইনের মধ্যেই যেন চাতকের পুরো দর্শন ধরা পড়ে- অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা, আর এক অদ্ভুত টান, যা যুক্তির চেয়ে অনুভূতির কাছে বেশি সত্য। এখানে ‘কালো শশী’ যেন সেই অধরা প্রিয়, যার জন্য চাতক অবিরাম চেয়ে থাকে। অর্থাৎ লালন সাঁইয়ের গান থেকে শুরু করে সুফি দর্শনে চাতক এক অনন্য উদাহরণ। তবুও এই কল্পনাটিই চাতককে বিশেষ করে তুলেছে। সাহিত্যে এটি একাগ্রতা, আকাঙ্ক্ষা এবং অপূর্ণতার প্রতীক। প্রেমের কবিতায় প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা কিংবা জীবনের কোনো অধরা স্বপ্ন-সবকিছুর সঙ্গেই চাতকের তুলনা টানা হয়। মহাকবি কলিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যেও চাতক পাখির কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এ সৌন্দর্যের আড়ালে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশে চাতক পাখির সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণগুলো খুব পরিচিত: আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং খাদ্যসংকট। চাতক মূলত পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে, কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে সেই খাদ্যের জোগানই কমে গেছে। পাশাপাশি, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কমে যাওয়ায় এদের নিরাপদ বসবাসের জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো- এই পাখিকে নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে এর প্রকৃত সংখ্যা, আচরণ বা সংরক্ষণের উপায় নিয়ে সঠিক তথ্যও সীমিত। ফলে চাতক আজ শুধু কাব্যের প্রতীক নয়, বরং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার একটি নীরব চিহ্ন হয়ে উঠছে। চাতক পাখির দিকে তাকালে আমরা দুইটি জগৎ দেখতে পাই- একটি কল্পনার, যেখানে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করে; আরেকটি বাস্তবের, যেখানে সে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। এ দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হয়-আমরা কি চাতককে শুধু কবিতায় রেখে দেব, নাকি প্রকৃতিতেও তাকে বাঁচিয়ে রাখব? চাতকের গল্প শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের গল্পও-অপেক্ষা, আশা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প।

লেখক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত