প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের জন্য সরকার 'এক গ্রাম এক পণ্য' কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে| এ উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে| শীতলপাটি, শতরঞ্জি, তাঁত, মৃৎশিল্প ও বুনন শিল্পের মতো পাঁচটি পণ্য নিয়ে শুরু হচ্ছে এ কর্মসূচির পাইলট প্রকল্পের পথচলা| বলা বাহুল্য, গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আধুনিক নকশা ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করে তোলার এ প্রয়াস অত্যন্ত সময়োপযোগী|
শত শত বছর ধরে আমাদের কারুশিল্পীরা যেসব পণ্য তৈরি করে আসছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উপযুক্ত ব্র্যান্ডিং ও সংযোগের অভাবে এতদিন সেসবের কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন হয়নি| এ উদ্যোগ সফল হলে গ্রাম পর্যায়ে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের বহুমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, স্বভাবতই তা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারে বিশাল ভূমিকা রাখবে|
তবে অবকাঠামো তৈরি এবং বিপুল অঙ্কের তহবিল সংস্থানের পরিকল্পনা যতই প্রশংসনীয় হোক, বাস্তবায়নের পথটি মোটেই সহজ নয়| বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, কেবল মেগা প্রকল্প বা আঞ্চলিক হাব গড়ে তুললেই কারুশিল্পীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না| কারণ ইতিহাস বলে, অতীতেও সরকারি উদ্যোগে নানা অবকাঠামো তৈরি হলেও টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়েছে| তাই সরকারের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি বাস্তবমুখী ও সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা| একজন প্রান্তিক কারিগর যেন সহজে আন্তর্জাতিক মানের কাঁচামাল পান, ব্যাংক ঋণের জটিলতা থেকে মুক্ত থাকেন এবং তার উদ্ভাবনী পণ্যের কপিরাইট ও জিআই সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন| এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সঠিক সমন্বয় ছাড়া এ বিশাল লক্ষ্য অর্জন করা দুরূহ|
আমরা মনে করি, কারুশিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে পেশাদার ডিজাইন ও সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজার সংযোগ তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি| সেক্ষেত্রে ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল পুল অফ ডিজাইনার্স' গঠনের সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ| তবে এই ডিজাইনার পুলকে শুধু শীর্ষপর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে কারিগরদের সথে সরাসরি কাজের পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে| এছাড়া ব্র্যাকের মতো অভিজ্ঞ এনজিওগুলোর বাজারভিত্তিক গবেষণা ও অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে| পাশাপাশি ই-কমার্স প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক ডেলিভারি নেটওয়ার্ক সহজ করার মাধ্যমে সরাসরি প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সথে বিদেশি ক্রেতাদের সেতুবন্ধন গড়ে তোলা সম্ভব|
ভুলে গেলে চলবে না, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্রিয়েটিভ ইকো-সিস্টেম গড়ে তুলতে না পারলে এ বিপুল অর্থায়ন শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না| কাজেই প্রকল্পটির অর্থের অঙ্ক কতটা বড়, এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে এবং কোন খাতে তা ব্যবহার হচ্ছে| একইসথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর-সহায়তা প্রদান এবং স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও তরুণ উদ্যোক্তাদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা খুবই প্রয়োজন| কারুশিল্পীদের স্বাবলম্বী করার এ লক্ষ্যে সরকার শতভাগ সফল হবে এবং 'ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ' ব্র্যান্ড বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করবে, এটাই প্রত্যাশা|