ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পাচারকারীদের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

আমানুর রহমান
পাচারকারীদের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

একটি শিশুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের পারিবারিক শোকের বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরে। সাম্প্রতিক সাত মাসের পুলিশি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজের তথ্য উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যার একটি বড় অংশ উদ্ধার হলেও ২,০৩৮ জন শিশুর কোনো খোঁজ মেলেনি, যা মোট জিডির প্রায় ১৩ শতাংশ। প্রশাসনিকভাবে একে হয়তো একটি স্বাভাবিক হিসাব বা শতকরা হার হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু বাস্তবিকভাবে এটি দুই হাজারের বেশি ঘরের আলো নিভে যাওয়ার এক করুণ সত্য।

কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তাকে শুধু রাস্তা ভুলে যাওয়া কিংবা দিকভ্রান্তির দোহাই দিয়ে হালকা করে দেখার উপায় নেই, কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের হদিস না পাওয়া মূলত সংগঠিত অপরাধচক্রের সক্রিয়তা এবং উদ্ধার তৎপরতার গাফিলতিকেই নির্দেশ করে। তাই একটি শিশুও যদি পরিবারের কাছে ফিরে না আসে, তবে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

?প্রশাসনিক ব্যাখ্যায় বহু সময় দাবি করা হয় যে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা প্রধানত পরিবারের সাথে অভিমান করে, পড়াশোনার চাপে কিংবা স্বাধীন জীবনযাপনের আকর্ষণে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এসব কারণকে স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তব পরিসংখ্যান ও তথ্য আমাদের এক ভিন্ন ও শিউরে ওঠার মতো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জাতিসংঘের 'ভাইয়োলেন্স এগেইনস্ট চিলড্রেন' বিষয়ক রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই শিশু। খুলনার বারো বছর বয়সী এক কিশোরীর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কীভাবে সামান্য পরীক্ষার ফলাফলে ব্যর্থ হয়ে ঘর ছাড়া একটি মেয়ে পরিচিত অপরাধীর খপ্পরে পড়ে সীমান্ত পার হয়ে পাচার হয়ে যায় এবং চরম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়।

আমেরিকার 'ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন'-এর তথ্যমতে, ঘর থেকে পালানো শিশুদের অন্তত ১৭ শতাংশই শেষ পর্যন্ত যৌন শোষণ ও ভিক্ষাবৃত্তির মতো অপরাধচক্রের কবলে পড়ে। ফলে অভিমান বা ঘর ছাড়ার পেছনের আপাত সহজ ঘটনাগুলোকে সাধারণ বিষয় ভাবার কোনো অবকাশ নেই, কারণ এসব শিশুই পাচারকারীদের সবচেয়ে সহজ শিকারে পরিণত হয়।

?আমাদের দেশে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতা এই সংকটকে দিন দিন আরও ঘনীভূত করছে। বর্তমানে দেশের কোনো একটি নির্দিষ্ট থানায় শিশু নিখোঁজের জিডি হলে তার তথ্য সরাসরি পাশের থানা কিংবা জেলাগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছানোর কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই। ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই শিশু নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির হার প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ এই ক্রমবর্ধমান হার মোকাবিলার জন্য কোনো সমন্বিত রিয়েল-টাইম ডাটাবেজ গড়ে তোলা হয়নি।

বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল উদ্ধার তৎপরতা চালানোর দায়ভার এসে পড়ে সাধারণ মানুষের পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলোর ওপর, যারা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়ন ও শ্রম দিয়ে নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালায়। একটি বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তি থাকার পরও যদি সমন্বয়ের অভাবে থানাগুলোতে ফাইলের নিচে জিডি চাপা পড়ে থাকে, তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এই প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রযুক্তিগত স্থবিরতা অপরাধীদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করে দেয়।

?আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, তবে দেখতে পাব উন্নত দেশগুলো শিশু সুরক্ষায় আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রগতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯০ সালের 'ন্যাশনাল চাইল্ড সার্চ অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট' অনুযায়ী শিশু হারিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর কোনো ২৪ ঘণ্টার 'ওয়েটিং পিরিয়ড' বা অপেক্ষার সময় রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। গবেষণায় দেখা গেছে, অপহৃত শিশুদের ওপর ঘটা বড় ধরনের অপরাধের বেশিরভাগই ঘটে ঘটনার প্রথম তিন ঘণ্টার মধ্যে, যে সময়টিকে বলা হয় 'গোল্ডেন আওয়ার'।

২০০৬ সালের 'অ্যাডাম ওয়ালশ অ্যাক্ট' অনুযায়ী রিপোর্ট পাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তথ্য জাতীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করতে হয় এবং 'অ্যাম্বার অ্যালার্ট' ব্যবস্থার মাধ্যমে লাখ লাখ নাগরিকের মোবাইলে নিখোঁজ শিশুর তথ্য পৌঁছে দিয়ে হাজার হাজার শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এমনকি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সামাজিক কল্যাণ সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মাত্র পাঁচ দিনের বিশেষ অপারেশনে বিভিন্ন রাজ্য ও দেশ থেকে ১৬৩ জন নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জাতীয় ডাটাবেজের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক তৎপরতা, যা আমাদের দেশেও কার্যকর করা আবশ্যক।

?শিশু নিখোঁজের মতো এ স্পর্শকাতর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আর কোনো আনুষ্ঠানিক অজুহাত নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমেই দেশের সব থানার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে একটি রিয়েল-টাইম 'ন্যাশনাল মিসিং চিলড্রেন ডাটাবেজ' প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যাতে জিডি হওয়ার সাথে সাথেই ছবিসহ সব তথ্য সারা দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। এর পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অপেক্ষমাণ সময় বাতিল করে ঘটনা ঘটার প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যেই জরুরি তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি নির্দিষ্ট সময় পরপর বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ সমন্বয়ে দেশব্যাপী বিশেষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং উদ্ধার হওয়া শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষার জন্য ডেডিকেটেড সেন্টার তৈরি করতে হবে। ২,০৩৮ জন হারিয়ে যাওয়া শিশু কেবল একটি গাণিতিক সংখ্যা নয়, তারা ২,০৩৮টি পরিবারের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন, যারা প্রতিটি মুহূর্ত কাটায় প্রিয় সন্তানের ফিরে আসার আকুল অপেক্ষায়। প্রতিটি শিশুকে নিরাপদে তার পরিবারের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সুরক্ষিত শৈশব নিশ্চিত করাই একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

লেখক : শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত