ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঢাকার স্ট্রিট ফুড : স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতি

ড. লিপন মুস্তাফিজ
ঢাকার স্ট্রিট ফুড : স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতি

ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনে স্ট্রিট ফুড বা পথের খাবার এখন এক পরিচিত দৃশ্য। রাস্তার মোড়, ফুটপাত, বাজার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জমে থাকে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, সিঙ্গারা, সমুচা, কাবাব ও নানা ধরনের ভাজাপোড়ার দোকান। কম দাম, সহজলভ্যতা এবং স্বাদের কারণে এসব খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহও বেশ। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, শ্রমিক কিংবা পথচারী বিভিন্ন শ্রেণির মানুষই কোনো না কোনো সময় এসব দোকানের ক্রেতা হন। কিন্তু খাবারের স্বাদ ও দামের বাইরে এর পরিবেশের দিকে তাকালে চিত্রটা সব সময় স্বস্তিদায়ক নয়।

অনেক দোকান বসে ব্যস্ত সড়কের একেবারে পাশে। পাশ দিয়ে ছুটে যায় বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল; বাতাসে মিশে থাকে ধুলাবালি ও যানবাহনের ধোঁয়া। খোলা অবস্থায় রাখা খাবারের ওপর এসব ধুলা-ময়লা পড়ার আশঙ্কা থাকে। কোথাও আবার খাবারের দোকানের পাশেই দেখা যায় নোংরা ড্রেন, জমে থাকা পানি কিংবা ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা। এমন পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হলে তার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

বর্ষাকালে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়। ড্রেন উপচে ময়লা পানি রাস্তায় চলে আসে, কোথাও কোথাও দোকানের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেই সঙ্গে বাড়ে মশা-মাছির উপদ্রব।

খাবার তৈরির পানি নিরাপদ না হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। ফুচকা, চটপটি, শরবত বা সালাদের মতো খাবারে পানির ব্যবহার বেশি হওয়ায় এ ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দরকার।

অপরিষ্কার পাত্র, হাত বা রান্নার সরঞ্জাম থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে। তবে স্ট্রিট ফুড মানেই অস্বাস্থ্যকর এমন সিদ্ধান্তও ঠিক হবে না। অনেক বিক্রেতাই সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন। সমস্যা মূলত একটি মানসম্মত ব্যবস্থা না থাকার। নিরাপদ পানি, খাবার ঢেকে রাখার ব্যবস্থা, পরিষ্কার পাত্র এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

খাবারের ধরনও এখানে বিবেচনার বিষয়। সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি বা বিভিন্ন ভাজাপোড়ায় তেলের ব্যবহার বেশি হয়। একই তেল দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা হলে তা নিয়ে স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত লবণ, ঝাল ও মসলার ব্যবহারও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের জন্য ভালো নয়। ফলে রাস্তার খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণ ও মান দুটির দিকেই নজর দেওয়া দরকার। পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব কম নয়।

প্রতিদিন এসব দোকান থেকে তৈরি হয় প্লাস্টিকের কাপ, প্যাকেট, প্লেট, বোতল ও নানা ধরনের উচ্ছিষ্ট। নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার ব্যবস্থা না থাকলে সেগুলো রাস্তা বা ড্রেনে জমে যায়। প্লাস্টিক ও খাবারের বর্জ্য ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দিলে সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। শহরের পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর তাই এ ব্যবসার একটি পরোক্ষ চাপ রয়েছে।

আবার ফুটপাতের ওপর দোকান বসানোর ফলে পথচারীদেরও সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক এলাকায় হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে মানুষকে মূল সড়কের দিকে নেমে আসতে হয়। ক্রেতাদের ভিড় ও দোকানের সরঞ্জাম রাস্তার অংশ দখল করলে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। ফলে স্ট্রিট ফুডের সঙ্গে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটিও জড়িয়ে আছে। তারপরও এ ব্যবসাকে শুধু সমস্যার চোখে দেখার সুযোগ নেই।

ঢাকার হাজারও মানুষের জীবিকার সঙ্গে স্ট্রিট ফুড সরাসরি যুক্ত। অল্প পুঁজি নিয়ে একজন মানুষ একটি ঠেলাগাড়ি বা ছোট দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এর মাধ্যমে তার নিজের কর্মসংস্থান হয়, পাশাপাশি একজন বা দুজন কর্মীরও কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাংস, মসলা কিংবা অন্যান্য উপকরণ কেনার কারণে এই ছোট ব্যবসার সঙ্গে আরও অনেক মানুষের আয় জড়িত।

নগর অর্থনীতিতেও এর ভূমিকা রয়েছে। রেস্তোরাঁর তুলনায় কম দামে খাবার পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য স্ট্রিট ফুড একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। শিক্ষার্থী কিংবা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী খাবারের এই ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। একই সঙ্গে অনেকের জন্য এটি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রথম ধাপ। ছোট পরিসরে শুরু করা ব্যবসা সময়ের সঙ্গে বড়ও হতে পারে। সমস্যা হলো, এ ব্যবসার বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক।

অনেক বিক্রেতার স্থায়ী দোকান নেই, ব্যবসার নিবন্ধন নেই কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত। আবার ফুটপাত দখল বা নগর ব্যবস্থাপনার কারণে উচ্ছেদের আশঙ্কাও থাকে। ফলে একদিকে শহরের চলাচল ও পরিবেশ ঠিক রাখা দরকার, অন্যদিকে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ দ্বন্দ্বের সমাধান স্ট্রিট ফুড উচ্ছেদে নয়, বরং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায়। নির্দিষ্ট এলাকায় স্ট্রিট ফুডের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা যেতে পারে। সেখানে নিরাপদ পানি, ডাস্টবিন, বর্জ্য অপসারণ এবং পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা থাকবে। খাবারের দোকান যেন নোংরা ড্রেন বা ময়লা পানির পাশে না বসে, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি বিক্রেতাদের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

ক্রেতাদের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের স্বাদ বা দাম দেখার পাশাপাশি দোকানের আশপাশের পরিবেশ, খাবার ঢেকে রাখা হয়েছে কি না এবং পানি ও পাত্র কতটা পরিষ্কার—এসব বিষয়ও খেয়াল করা দরকার। ভোক্তার চাহিদা ও সচেতনতা বাড়লে বিক্রেতারাও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে উৎসাহিত হবেন।

ঢাকার স্ট্রিট ফুড তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের একটি ক্ষেত্র। রাস্তার ধুলাবালি, যানবাহনের ধোঁয়া, নোংরা ড্রেন, ময়লা পানি ও বর্জ্য যেমন এর দুর্বল দিক, তেমনি কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা এর বড় শক্তি। শহরের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতকে বাদ দেওয়ার বদলে নিয়মের মধ্যে এনে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগই বেশি কার্যকর। এতে একদিকে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে হাজারো মানুষের জীবিকার পথও সচল থাকবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ

কলামিস্ট ও সহযোগী অধ্যাপক (খন্ডকালীন)

সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত